সাগরপথে মানবপাচারের অন্যতম হটস্পট কক্সবাজার। প্রায় নিয়মিতই মানবপাচারের ঘটনায় মামলা হচ্ছে। তবে বিচারের নজির খুবই কম। গত এক যুগে জেলায় দায়ের হওয়া প্রায় দেড় হাজার মানবপাচার মামলার মধ্যে রায় হয়েছে মাত্র ১০টির। সাক্ষী হাজির না হওয়া, তদন্তের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে থমকে আছে অধিকাংশ মামলা। পাশাপাশি মানবপাচার অপরাধ দমনে এখনো গঠন করা হয়নি আলাদা ট্রাইব্যুনাল।
কক্সবাজার শহরের বড়ুয়াপাড়ার বাসিন্দা সুমন বড়ুয়া ২০১৪ সালে মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি পাচারকারীদের কবলে পড়ে থাইল্যান্ডে দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হন। প্রায় এক বছর কারাভোগের পর দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফিরে ২০১৫ সালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ মামলা করলেও এখনো বিচার পাননি।
সুমন বড়ুয়ার হাতে থাকা একটি চুক্তিপত্রে দেখা যায়, তিনি থাইল্যান্ডে জিম্মি থাকাকালে তাকে মুক্ত করার কথা বলে পাচারকারীরা তার মেজো ভাইয়ের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েছিল। ২০১৪ সালের সেই ঘটনার পর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। প্রতিনিয়ত আদালতে হাজিরা দিয়েও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ তার।
সুমন বড়ুয়া বলেন, ২০১৪ সালের দিকে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে আমাকে মালয়েশিয়া নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে থাইল্যান্ডে গিয়ে দীর্ঘ প্রায় এক বছর জেল খেটেছি। দেশে ফিরে দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করি। পরে সেটি সরকার বাদী মামলা হয়। শুরুতে আমাকে এক-দুইবার কোর্টে ডাকা হলেও ২০১৬ সালের পর থেকে মামলার আর কোনো অগ্রগতি দেখছি না।
সুমন বড়ুয়ার আইনজীবী বিশ্বজিত ভৌমিক বলেন, যেসব সাক্ষী চাক্ষুষ সাক্ষী এবং যাদের সাক্ষ্য মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তারা আদালতে হাজির না হলে বিচারকদের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়।
শুধু সুমন বড়ুয়ার ঘটনাই নয়, কক্সবাজারে গত এক যুগে অন্তত দেড় হাজার মানবপাচারের মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে বর্তমানে ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক মামলার মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ১০টির মতো।
বিশ্লেষকদের মতে, মানবপাচারের মামলাগুলোতে এজাহার ও চার্জশিটে নানা ত্রুটি থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীদের ঠিকানা সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয় না, আবার মূল হোতাদের নামও বাদ পড়ে যায়। ফলে সঠিক বিচার নিশ্চিত হয় না।
আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, সত্য ঘটনা থাকার পরও যদি আসামিরা খালাস পেয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে প্রমাণের ঘাটতি ছিল। আর এই প্রমাণের ঘাটতির দায় তদন্তকারী সংস্থার।
বেসরকারি সংস্থা নোঙরের নির্বাহী পরিচালক দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, মানবপাচারকারীরা বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক কিছু ম্যানেজ করে ফেলে। ফলে অনেক সময় পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকে না। তখন আদালতেরও কিছু করার থাকে না এবং আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও প্রোগ্রাম হেড শরিফুল হাসান বলেন, মানবপাচার একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের আদালতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা হয় না। তদন্ত দুর্বল হলে এবং সাক্ষী হাজির করা না গেলে ভুক্তভোগীরা বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে ঘুরতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় তারা আপসও করে ফেলেন। আবার পাচারকারীরা তাদের হুমকিও দেয়।
সাগরপথে অবৈধ মানবপাচারের জন্য কক্সবাজারকে অন্যতম গেটওয়ে হিসেবে ধরা হলেও জেলায় এখনো আলাদা মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল নেই। ফলে এসব মামলার বিচার চলছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। এমনিতেই এসব আদালতে মামলার চাপ বেশি থাকায় মানবপাচারের মামলাগুলোর বিচারকাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পিপি তাওহিদুল আনোয়ার বলেন, মানবপাচার মামলার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট থাকলে বিচার দ্রুত হতো। বর্তমানে নারী নির্যাতনের মামলার পাশাপাশি মানবপাচারের মামলাও একই আদালতে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে পুলিশের দাবি, আদালতের নির্দেশনা থাকলেও সাক্ষী হাজির করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, ভুক্তভোগীদের অনেকেই পরে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী থাকেন না।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) অহিদুল ইসলাম বলেন, অনেকেই বাদী হতে চান না। কারণ তারা নিজেরাও বিদেশ যাওয়ার জন্য রাজি ছিলেন। পরে ভুক্তভোগীরা সাক্ষী হিসেবেও অনাগ্রহ দেখান। এমনকি আদালতে গিয়েও অনেকে সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারে মানবপাচার বন্ধ করতে হলে গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মামলাগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত তদারকি ও কার্যকর উদ্যোগ।