Image description

সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, দুর্লভ বই ও শতবর্ষী ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মাহবুব উল আলম চৌধুরী পাবলিক লাইব্রেরি। গড়ে প্রতিদিন মাত্র ২৫ জন পাঠক আসছেন এ গ্রন্থাগারে। সে হিসাবে প্রতি দুজন পাঠকের বিপরীতে কাজ করছেন দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র লালদীঘিতে অবস্থিত শতবর্ষী এ গ্রন্থাগারটি ১৯০৪ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম ভবনে ‘চিটাগাং মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরি’ নামে যাত্রা শুরু করে। এটি চট্টগ্রামের প্রথম গ্রন্থাগার। ১৯২৩ সালে গ্রন্থাগারটি আন্দরকিল্লা থেকে লালদীঘির দক্ষিণ পাড়ে (বর্তমান) স্থানান্তর করা হয়। ২০১৭ সালে শতবর্ষী ও ঐতিহাসিক পুরোনো তিনতলা ভবন ভেঙে আটতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলা গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং, দ্বিতীয় তলায় সম্মেলন কক্ষ, তৃতীয় তলায় সাইক্লোন শেল্টার, চতুর্থ তলায় শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সপ্তম তলায় ক্রীড়া একাদশের কার্যালয় এবং অষ্টম তলা রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গ্রন্থাগারের প্রতি তলার আয়তন ৪ হাজার বর্গফুট।

গ্রন্থাগার সূত্রে জানা যায়, শুক্র, শনিবার ও সরকারি বন্ধের দিন ছাড়া গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এবং শীতকালে দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মাত্র পাঁচ ঘণ্টা খোলা থাকে এ গ্রন্থাগার। এখানে শতাধিক পাঠকের একসঙ্গে বসে বই পড়ার সুবিধা রয়েছে। দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ। সেখানেও বসার ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া ২২টি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়।

পাঠকদের অভিযোগ, গ্রন্থাগারে আপডেট বই পাওয়া যায় না। দুর্লভ বই থাকার কথা বলা হলেও অনেক বই পাওয়া যায় না। ক্যাটালগ নেই। দুপুর পর্যন্ত পাঠাগার খোলে না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য খোলা থাকায় পাঠকের আগ্রহ কমে গেছে।

সরেজমিন গত সোমবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত গ্রন্থাগার ঘুরে দেখা যায়, পুরো পাঠাগার চকচকে-তকতকে। সুন্দর ফার্নিচার দিয়ে সাজানো হয়েছে। চকচকে চেয়ার-টেবিল ও টাইলস করা মেঝে আলো ঝলমলে পরিবেশ তৈরি করেছে। তাকে তাকে সাজানো রয়েছে বই। তবে পাঠক উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনের পাঠক নিবন্ধন বই বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গড়ে প্রতিদিন ২৫ জন পাঠক এসেছেন। এর মধ্যে গত ১০ মে সর্বোচ্চ ৩৪ জন পাঠক আসেন। অন্য দিনগুলোয় ২১ জন, ২২, ৩০, ২৮ ও ১২ জন করে পাঠক এসেছেন। বছরের অন্যান্য সময়ও একই চিত্র দেখা গেছে। আসা পাঠকদের অধিকাংশই পত্রিকা পড়তে আসেন। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার বই ও নথিপত্রের সংগ্রহ রয়েছে ১২২ বছরের পুরোনো এ গ্রন্থাগারে।

গবেষক ও পাঠকদের মতে, এটি শুধু বই পড়ার স্থান নয়। প্রাচীন ইতিহাস ও ব্রিটিশ-ভারতের বহু দুর্লভ দলিলের জীবন্ত সংগ্রহশালা হিসেবেও পরিচিত। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের দুটি দুর্লভ বই। এ ছাড়া ১০০ বছরের বেশি পুরোনো অন্তত ৩০০টি ঐতিহাসিক বই রয়েছে। গ্রন্থাগারের অন্যতম আকর্ষণ বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এর প্রথম সংস্করণ। প্রাচীন চিত্রকর্মে সমৃদ্ধ বইটি বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের কয়েকশ বছরের কালজয়ী মূল ক্ল্যাসিক গ্রন্থের সঙ্গে সংরক্ষিত আছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক নথিপত্র এবং ইতিহাস জানার জন্যও এ গ্রন্থাগারের সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রাচীন সরকারি গ্যাজেট, গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকী, পুরোনো সংবাদপত্র ও অফিসিয়াল প্যাটেন্ট নথির মূল কপি এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

এ ছাড়া ইতিহাস, ধর্মীয়, সংস্কৃতি, সাহিত্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান, মেডিকেল বিজ্ঞান, পুথি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দুর্লভ গ্রন্থ রয়েছে। তবে অধিকাংশ বইয়ের অবস্থা জরাজীর্ণ। ভবন পুনর্নির্মাণের সময় কিছু বই, পত্র-পত্রিকা, গ্যাজেট ও সাময়িকী চট্টগ্রামের বিবিরহাটের আর্বান হেলথ কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বস্তাবন্দি করে রাখার ফলে বিভিন্ন পুরোনো বই নষ্ট হয়েছে।

গ্রন্থাগারের এক কোনায় বসে বই থেকে নোট নিচ্ছিলেন আব্দুল হান্নান নামে এক পাঠক। নিজেকে গীতিকার পরিচয় দিয়ে তিনি জানান, ২০০০ সাল থেকে নিয়মিত এ গ্রন্থাগারে আসছেন তিনি। আগে পাঠক সংখ্যা মোটামুটি থাকলেও এখন কমে গেছে। তার ভাষ্য, গ্রন্থাগারে ক্যাটালগার ও বুক শাটার নেই। নতুন বই নেই। কক্ষ সহকারী ও অভিজ্ঞ লোকবলও নেই। এজন্যই পাঠক আসে না।

পঞ্চম তলায় বাসা থেকে বই এনে পড়ছিলেন সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী। তাদের একজন সাইমন হোসেন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত আসার চেষ্টা করি। কিন্তু গ্রন্থাগার খুব অল্প সময়ের জন্য খোলা থাকে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কিংবা অফিস সময়টুকু খোলা থাকলে পাঠক আসবে। আবার প্রচারণার অভাবে অনেকে জানেও না, এখানে এতবড় গ্রন্থাগার আছে। সময় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচারণায়ও একটু জোর দেওয়া দরকার।’

মোহাম্মদ কানন বলেন, ‘গ্রন্থাগারের বাইরের পরিবেশও পাঠক অনুকূল নয়। গ্রন্থাগারের পাশেই ভাসমান মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করে। ছিন্নমূল লোকজন মাদক ও জুয়ার আসর বসায়।’

সিটি করপোরেশন পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক কৃষ্ণ কমল সেন কালবেলাকে বলেন, ‘গ্রন্থাগারে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে। ৩৫ থেকে ৪০ হাজার বই, পত্রিকা ও ম্যাগাজিন আছে। ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তবে পাঠক কিছুটা কম আসে। মূলত রেফারেন্স লাইব্রেরি হিসেবেই এই পাঠাগারের ব্যবহার বেশি।’ পাঠের সময় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের হাতে নেই।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আশরাফুল আমিন প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা কালবেলাকে বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে সরেজমিন গ্রন্থাগার ঘুরে এসেছি। কিছুদিনের মধ্যে পুরো টিম নিয়ে আবার যাব। গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশনা দিয়েছি পাঠকের চাহিদাগুলো নোট করে আমাদের দেওয়ার জন্য। পাঠকদের চাহিদা পেলে আমরা সে আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। পাঠকদের গ্রন্থাগারমুখী করতে যা করণীয়, আমরা তাই করার চেষ্টা করব।’