আইনগত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা সত্ত্বেও নানা উপায়ে আবারও রাজনীতির মাঠে ফিরতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে স্বাভাবিক রাজনীতিতে দলটির ফিরে আসা সহজ নয়; তবে দলটির নেতারা বলছেন, তারা কঠিন এই যাত্রা ইতোমধ্যে শুরু করেছেন।
সূত্র জানায়, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন খাতের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দলটির রাজনীতিতে ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরির সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। আইনগত বাধাসহ সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দলটিকে আবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের সব অঙ্গসংগঠন কাজ করছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আশাবাদী ছিলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে। কিন্তু বিএনপি সরকার সেই নিষেধাজ্ঞাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অন্তর্ভুক্ত করে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেছে।
দলটির নির্বাসিত নেতাদের নির্দেশনায় রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনগুলো একই সুরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। এতে ১৭৩ আইনজীবী স্বাক্ষর করেন। তারা বলেন, সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই আইন অবৈধ এবং এটি মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি।
একইভাবে ১০১ আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিক নেতাও গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংগঠনটি এপ্রিলের মধ্যে সব ইউনিট কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ১৭ এপ্রিল অনলাইনে নির্দেশ দেন, ১৭ মের মধ্যে জেলা, শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কমিটি গঠন সম্পন্ন করতে।
এ ছাড়া দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো গোপন বৈঠক, হঠাৎ মিছিল ও স্বল্প সময়ের মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। লক্ষ্মীপুরে নদীর তীরে রাতে এক গোপন বৈঠকে নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার শপথ নেন। অবশ্য এ ঘটনায় একজন স্থানীয় যুবলীগ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ।
এদিকে জাতীয় দলের অলরাউন্ডার ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান এক সাক্ষাৎকারে আবার ক্রিকেট ও রাজনীতিতে ফেরার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আগে নিয়মিত ক্রিকেটে ফিরতে চান, এরপর রাজনীতিতে। তিনি বলেন, দেশের রাজনীতি শিগগিরই স্বাভাবিক হয়ে আসবে যাতে সবাই সক্রিয়ভাবে দলীয় কার্যক্রম চালাতে পারবে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ও তার সহযোগীরা শাহবাগ থানার সামনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর চেষ্টা করলে ডাকসু নেতারা বাধা দেন। পরে পুলিশ ইমিসহ কয়েকজনকে আটক করে। গেল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) তিনি জামিন পান।
এ ছাড়া ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতেই এসব কার্যক্রম হয়েছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার বিএনপি সভাপতি আবু দাউদ প্রধান নিজে উপস্থিত থেকে একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয় পুনরায় চালু করেন।
দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে কম বিতর্কিত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে একটি অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চিন্তা রয়েছে। সম্ভাব্য নামের মধ্যে রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাকিব আল হাসান, অভিনেতা ফেরদৌস প্রমুখ।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাসিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনও সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ভিত্তিতে আমাদের নিষিদ্ধ করা অবৈধ।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে এবং জনগণ আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন চায়।’
তিনি দাবি করেন, ‘দেশের মানুষ এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে দিশাহারা এবং দেশে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।’
বাহাউদ্দিন নাসিম বলেন, ‘আমরা গুগল সার্চের মাধ্যমে জেনেছি অন্তত ছয় কোটি মানুষ নিজেদেরকে আওয়ামী লীগ বলে দাবি করছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জুলুম-পীড়ন চালিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’
দলটির তৃণমূল নেতারাও একই রকম অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতা ইকবাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই দেশের রাজনীতিতে ভারসাম্য ফিরে আসবে।’
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের ফেরার প্রচেষ্টায় বিএনপির অবস্থান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দলটির রাজনীতিতে ফেরায় তাদের কোনো আগ্রহ নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে আগে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে এবং অতীত কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে হবে।’
একই সুরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আসাদুজ্জামান রিপন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলটি জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়বে। জনগণের কাছে তাদের গুম, খুন, সেনাহত্যার বিষয়ে আগে জবাবদিহি করতে হবে। এরপর জনগণ তাদের কি জবাব দেয় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আইনের মুখোমুখি হওয়ার পরই আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার কথা ভাবতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মাঠে ফেরার চেষ্টা স্বাভাবিক। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একটি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অবশ্যই সক্রিয়ভাবে মাঠে ফিরে আসার চেষ্টা করবে। তবে পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে তাদের সফলতা কতটুকু হতে পারে। অতীতের সরকার ভুল করার কারণেই অন্যদলের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি হয়েছ। তেমনি বর্তমান সরকার যদি ভুল করলে অন্যদের আসার সুযোগ তৈরি হবে।’