সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রাজধানী ঢাকায় বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। অথচ ঢাকার সড়কে বিশৃঙ্খলা কমাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস খাত সংস্কার করা উচিত ছিল। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা গেছে, রাজধানীতে সড়কে শৃঙ্খলার অভাবে সৃষ্ট যানজটে এক দশকে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবছর এই ক্ষতি হচ্ছে কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিটিসিএ, ট্রাফিক পুলিশের বাইরে সিটি করপোরেশন, বিআরটিসি, ডিএমটিসিএল ও বিআরটিএ ঢাকার গণপরিবহন সেবা দিলেও সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ফুটে উঠেছে।
এক দশকে ক্ষতি পাঁচ লাখ কোটি টাকা : ঢাকা মহানগরীতে যানজটে প্রতিবছর ক্ষতি হচ্ছে কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে ঢাকার যানজটের এক যুগে পাঁচ লাখ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রের। গত ১৪ মার্চ আইজিপি আলী হোসেন ফকির গাজীপুরে এক সভায় বলেছেন, “শুধু যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন ১৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, এই হিসাবে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয় সরকারের।
গত বছরের ২৬ জুন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সেমিনারে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মঈনুদ্দিন বলেছিলেন, ‘রাজধানীতে যানজটে বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে দুটি করে এমআরটি লাইন তৈরি করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে বছরে পাঁচ মিলিয়ন ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে।
প্রায় চার বছর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজট প্রতিবছর অর্থনীতিতে ৩৭ হাজার কোটি থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার (৩.৫ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি করে। এটি জিডিপির ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারানোর সমান।
শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, যানজটের স্বাস্থ্যঝুঁকিও মারাত্মক জানিয়ে প্রতিবেদন দেয় বিশ্বব্যাংক। বৈশ্বিক এই সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে যানবাহনজনিত বায়ুদূষণ বাংলাদেশে ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল, যা জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ ক্ষতির সমান।
২০২০ সালে ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদ এবং ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম গবেষক আশরাফুল আলম রতন ঢাকার গণপরিহন ও যানজট নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সাইফুদ্দিন আহমেদ তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ২০০৭ সালে ঢাকায় গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৮ কিলোমিটারে। ঢাকায় যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে দৈনিক প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা, অর্থমূল্যে যা দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার অধিক।
ডিটিসিএর অধীনে ২০১৬ সালে অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী মেট্রো রেল, বিআরটি, সড়ক নেটওয়ার্কসহ একটি সমন্বিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ট্রাফিক পুলিশের সহযোগিতা করার কথা থাকলেও ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ ডিটিসিএর। যানবাহনের নিবন্ধন, রুট পারমিট ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), যা সড়ক পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করে। ঢাকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে ডিটিসিএকে সহযোগিতা না করার। সরকারি বাস পরিচালনা করে বিআরটিসি এবং বেসরকারি বাস খাত নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন।
ডিটিসিএর বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম বলেন, ‘আমরা ঢাকার পরিবহনের সমন্ব্বয়ের দায়িত্বে থাকলেও অন্যান্য সংস্থার পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে দুই সিটি করপোরেশন, মেট্রো রেল পরিচালনা করছে ডিএমটিসিএল। এদিকে মেট্রো রেলের পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ডিএমটিসিএলেরও নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ডিটিসিএকে। কিন্তু ডিটিসিএকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে না মানার বিষয়টি অবহিত করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাস রুট নির্ধারণ ঘিরে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৯ হাজার বাস ২৯১টির বেশি রুটে চলাচল করে। এই বিশৃঙ্খলা রোধে ডিটিসিএ ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যার লক্ষ্য শতাধিক বেসরকারি বাস কম্পানিকে সীমিতসংখ্যক কম্পানির অধীনে এনে নির্দিষ্ট রুটে পরিচালনা করা। এই পরিকল্পনায় রুট কমিয়ে ডিটিসিএ ৪২টি রুট নির্ধারণ করে। তবে একই সময়ে ট্রাফিক পুলিশ নিজস্ব উদ্যোগে নতুন বাস রুট পরিকল্পনা করেছে, যা ডিটিসিএর পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি আইন অনুযায়ী ডিটিসিএর সঙ্গে সমন্বয় করে রুট নির্ধারণের কথা থাকলেও বিভিন্ন কমিটি ও সংস্থা আলাদাভাবে রুট অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে একই রুটে একাধিক পরিকল্পনা তৈরি হয়ে বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
ঢাকার বাস ব্যবস্থা শৃঙ্খলায় আনতে প্রথম পরিকল্পনা ২০১৬ সালে নিলেও ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ চালু হয়। দুই বছরের মধ্যে ২১, ২২ ও ২৬ নম্বর রুট চালু হলেও বাসের স্বল্পতা, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং একই রুটে অনিবন্ধিত বাস বন্ধ করতে না পারায় এ উদ্যোগটি টেকসই হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিটিসিএর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের উদ্যোগ নেওয়ার কথা, কিন্তু পুলিশ করছে। মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে সেটা আমরা বলেছি যে, পরিকল্পনা যদি তারা করতে চায় করুক, কিন্তু আমাদের পরামর্শ যেন নেয়। আমাদের পরিকল্পনা করতে দিয়ে তারা যদি বাস্তবায়ন করে, তাহলে ভালো হয়।’
ডিটিসিএর পরিকল্পনা করার কথা থাকলেও সেটি ট্রাফিক পুলিশ কেন করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত ডিআইজি আনিসুর রহমান বলেন, ‘ডিটিসিএর সঙ্গে আমরা সমন্বিতভাবে বাস রুট রেশনালাইজেশনের কাজ করছি। আমাদের বর্তমানে অনেকগুলো রুট বন্ধ আছে। নতুন কোনো রুটের প্রয়োজন আছে কি না বা ছোট ছোট রুট বাড়াতে হবে কি না তা আমরা ঠিক করছি।’
সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হক বলেন, ‘ডিটিসিএর উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও ট্রাফিক পুলিশ করছে। তবে সবাই মিলে আমরা যানজটমুক্ত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়তে চাই।’