অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এক অবিশ্বাস্য জামিন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে ‘কুকি-চিনের’ ২০ হাজার পোশাক জব্দের মামলার আসামি তথ্য গোপন করে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে তোলপাড় চলছে আদালত অঙ্গনে।
চাঞ্চল্যকর এই জামিন জালিয়াতির ঘটনা সরাসরি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নজরে আনেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল। বুধবার অ্যাটর্নি জেনারেলের অভিযোগ আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তে রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। একইসঙ্গে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। বিষয়টি নিশ্চিত করে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মানবজমিনকে বলেন, আমরা প্রধান বিচারপতির নজরে এনেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এর সঙ্গে জড়িত কারা আছেন সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারবো। এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতির ঘটনা সত্য। ইতিমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। আপনারা দ্রুতই তদন্তের অগ্রগতি জানতে পারবেন।
সূত্র মতে তথ্য গোপন করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়া হয়। সেই জামিন আদেশে দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর তা বদলে ফেলা হয়। পরে সেই জামিন আদেশ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করে বসানো হয় নতুন করে মামলার নাম্বার ও থানার নাম। পরে দাখিল করা হয় কারাগারে। দাখিল করা জামিন আদেশের ভিত্তিতেই কারাগার থেকে বেরিয়ে যান চট্টগ্রামে ‘কুকি-চিনের’ ২০ হাজার পোশাক জব্দের ঘটনায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম। যিনি চট্টগ্রামে অবস্থিত ‘রিংভো অ্যাপারেলসের’ মালিক। ৭ মাস আগে উচ্চ আদালতে তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ পেয়েছে চলতি সপ্তাহে। মামলার আরেক আসামি উচ্চ আদালতে জামিন নিতে এসে ওই আসামির জামিন প্রাপ্তির উদাহরণ টেনে আনলে বিষয়টি প্রকাশ পায়।
যেভাবে তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতি: সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম কারাগার থেকে জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। ওইদিনের অনলাইন কার্যতালিকা ঘেঁটে দেখা যায় চট্টগ্রামে জেলার ‘সাহেদুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ নামে দু’টি মামলা আসে। এর মধ্যে ১৩০ নম্বর আইটেমের (মামলা) টেন্ডার নাম্বার ছিল ৭৫৯৯১। ১৩২ নম্বর আইটেমের টেন্ডার নাম্বার ছিল ৭৫৯৯৩। দু’টি টেন্ডার নাম্বার মামলা কার্যতালিকায় এসেছে ‘সাহেদুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ নামে। তবে ১৩১ নম্বর আইটেমের মামলার টেন্ডার নাম্বার ছিল ৭৫৯৯৩। এই আইটেমটি এসেছে ‘সৈয়দ মিয়া বনাম রাষ্ট্র’ নামে। ১৩১ ও ১৩২ নাম্বার আইটেমের মামলার টেন্ডার নাম্বার হুবহু এক। এখানেই মূল জালিয়াতির ঘটনা সংঘটন হয়েছে বলে জানা গেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় জানিয়েছে, সাহেদুল ইসলাম নামের যে আসামিকে উচ্চ আদালত জামিন দিয়েছে তার এজাহার ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। সেখানে কুকি-চিনের নামে ২০ হাজার পোশাক জব্দের কোনো অভিযোগ ছিল না। যার কারণে উচ্চ আদালত আসামি সাহেদুল ইসলামকে জামিন দেন। সেই জামিন আদেশে দুই বিচারপতি স্বাক্ষর করেন। দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর জামিন আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় মামলার এজাহার ও থানার নাম্বার এবং অভিযোগের ধারা বদলে ফেলে বসানো হয় কুকি-চিনের নামে ২০ হাজার পোশাক জব্দের মামলার নাম্বার ও অভিযোগের ধারাসমূহ। এটাও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা সেই জামিন আদেশ কারাগারে দাখিল করে মুক্ত করে নেয়া হয় আসামি সাহেদুলকে। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মামলার অপর আসামি হাইকোর্টের আরেকটি দ্বৈত বেঞ্চে জামিন চান। সেই জামিন শুনানিতে মামলার মুখ্য আসামি সাহেদুল ইসলামের জামিন মঞ্জুরের বিষয়টি তুলে ধরেন আইনজীবী। পরে খোঁজ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় দেখে, তথ্য গোপন ও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সাহেদুলের জামিন হাসিল করা হয়েছে। এরপরই বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ই মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানা রিংভো অ্যাপারেলসের গুদাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের’ (কেএনএফ)-এর সদস্যদের জন্য তৈরি করা ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দায়ের করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। মামলায় রিংভো অ্যাপারেলসের মালিক সাহেদুল ইসলাম (২৫) ছাড়াও এসব পোশাক প্রস্তুতের ক্রয়াদেশ দেয়া গোলাম আজম (৪১) ও নিয়াজ হায়দারকেও (৩৯) আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দুই কোটি টাকা দিয়ে মংহলাসিন মারমা এবং কুকি-চীনের সদস্যদের কাছ থেকে এসব পোশাক তৈরির অর্ডার নেয়া হয়। রিংভো অ্যাপারেলসের প্রডাকশন ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানকে এসব পোশাক জব্দের সাক্ষী রাখা হয়েছে।
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট নামে এই সশস্ত্র সংগঠনের অস্তিত্ব সামনে আসে ২০২২ সালের শুরুর দিকে। বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, খুমি ও ম্রোদের নিয়ে এ সংগঠন গঠন করার কথা বলা হলেও সেখানে বম জনগোষ্ঠীর কিছু লোক রয়েছে। সে কারণে সংগঠনটি পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিতি পায়।