Image description

সম্প্রতি 'ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল' (IPDC)-এর আয়োজনে 'লিগ্যাসি অব ফেইথ' নামক একটি সিরিজ আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্ট্রেলিয়ায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী ও শায়খ আহমাদুল্লাহর

দেশটিতে পৌঁছানোর কয়েকদিনের মাথায় গত ৩১ মার্চ মিজানুর রহমান আজহারীর ভিসা বাতিল করে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া সরকার। অন্যদিকে, ৬ এপ্রিল শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসাও বাতিল করা হয়, যার ফলে তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়াই আটকে যায়। পরবর্তীতে ফেসবুকে ব্যক্তিগত পোস্টের মাধ্যমে তারা উভয়ে ভিসা বাতিলের বিষয়টি জানালে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

কেন তাদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে সে বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান এবং ব্রিটিশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের তথ্য মতে, উভয়ের ক্ষেত্রেই তাদের পুরনো কিছু বক্তব্যকে– যেগুলোকে ‘ইহুদীবিদ্বেষী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে–  ভিসা বাতিলের পেছনের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ভিসা বাতিল বিষয়ক অস্ট্রেলিয়ান ইমিগ্রেশন বিভাগের পাঠানো ইমেইলে তেমন স্পষ্ট কোন কারণ তাকে জানানো হয়নি।

 

পেছনে সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই জনের ভিসা বাতিলের ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের একটি নিয়মিত আইনি পদক্ষেপ মনে হলেও, অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় এর পেছনে কাজ করেছে 'অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ' (AFERMB) নামের একটি সংগঠন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিনেই অস্ট্রেলিয়ায় নিবন্ধিত এই সংগঠনটি আজহারী ও আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করেছে। 

 

 

সংগঠনটি কেবল এই দুই বক্তার ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রেই নয়, বরং জাতিসংঘ ও অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ‘তথ্য-উপাত্ত’ সরবরাহ করে আসছে বলে তাদের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে।

সংগঠনটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রকাশনা বিভাগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা তাদের অধিকাংশ ‘তথ্য-উপাত্ত’ মূলত বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের রিপোর্ট ও পরিসংখ্যান থেকে সংগ্রহ করে থাকে।

দ্য ডিসেন্ট-এর বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, সংগঠনটি তাদের ফেসবুক পেজে এমন সব কন্টেন্ট প্রচার করে যেগুলোতে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি এবং সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি পদক্ষেপকে 'সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন’ রূপে উপস্থাপন করা হয়।

এছাড়া, AFERMB নামক সংগঠনটির সাথে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং অস্ট্রেলিয়ায় আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের শীর্ষ পদধারী ব্যক্তিরা।

 

আজহারী ও শায়খ আহমাদুল্লাহর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ

অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আজহারী ও আহমাদুল্লাহর বিরুদ্ধে মূলত ইহুদিবিদ্বেষ এবং ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে হেয় করার অভিযোগ তুলে তাদের ভিসা বাতিলের দাবি জানিয়েছিল এএফইআরএমবি। 

AFERMB আজহারীর ও আহমাদুল্লাহর কিছু বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি লেখে। 

এর প্রেক্ষিতে লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডুনিয়াম পার্লামেন্টে আজহারীর ‘চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচার’, ‘ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য’ এবং হিন্দু ধর্মকে হেয় করার’ রেকর্ডের বিষয়টি তুলে ধরেন। যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ এবং ‘নিজ দেশে নজরদারিতে থাকা’ সত্ত্বেও এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা দেওয়া হলো, সে বিষয়ে তিনি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

 

 

তবে ভিসা বাতিলের পর এই দুই ইসলামি বক্তাই দাবি করেন, তাদের পুরোনো, বিচ্ছিন্ন বক্তব্য এবং ফিলিস্তিন ইস্যুর মন্তব্যগুলোকে খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে অনুবাদ করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

কারা চালাচ্ছে AFERMB?

অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস কমিশন এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিনেই ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে সিডনিতে অলাভজনক পাবলিক কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় এএফইআরএমবি।

ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড অনুযায়ী, সংগঠনটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (afermb.org.au) ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করা হয়। ঠিক একই দিনে সংগঠনটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজটিও চালু করা হয়। 

 

 

ওয়েবসাইটে নিজেদেরকে একটি "অরাজনৈতিক এবং মানবাধিকার রক্ষায় নিবেদিত দাতব্য সংস্থা" হিসেবে দাবি করলেও,বাস্তবে AFERMB মূলত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর একটি যৌথ নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে।

AFERMB এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, নেটওয়ার্কে যুক্ত ১৪টি সংগঠন হল:

১. অস্ট্রেলিয়ান বেঙ্গলি হিন্দু অ্যাসোসিয়েশন 

২. বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশন 

৩. বাংলাদেশ পূজা অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি, কুইন্সল্যান্ড

৪. বাংলাদেশ সোসাইটি ফর পূজা অ্যান্ড কালচার 

৫. বাঙালি সোসাইটি ফর পূজা অ্যান্ড কালচার, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া

৬. বেঙ্গলি পূজা অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি অব ভিক্টোরিয়া 

৭. বেঙ্গলি সোসাইটি অব মেলবোর্ন 

৮. বুয়েট আহসানউল্লাহ হল নর্থ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস অ্যালামনাই অস্ট্রেলিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজন (বাহনা)

৯. দেবীপক্ষ 

১০. জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়া 

১১. লোকনাথ ব্রহ্মচারী মিশন সিডনি

১২. পূজা অ্যান্ড কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্দার্ন টেরিটরি 

১৩. শঙ্খনাদ 

১৪. ত্রিনয়নী 

AFERMB এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরস’ এ আছেন ড. সমীর সরকার, অধ্যাপক জহর ভৌমিক, ড. স্বপন পাল, প্রকৌশলী দিলীপ দত্ত, প্রকৌশলী শর্মিষ্ঠা সাহা এবং অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CPA) অমল দত্ত। 

 

আওয়ামী সংযোগ

এই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের সাথে আওয়ামী লীগের সরাসরি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, সংগঠনটির নির্বাহী সভাপতি সুরজিৎ রায় একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং পরিচালক অমল দত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। 

এছাড়া মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর তুষার রায় ও সাধারণ সম্পাদক অপু সাহা অস্ট্রেলিয়ার 'বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল' ও 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অস্ট্রেলিয়া'-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত। সংগঠনটির গবেষণা ও শিক্ষা সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট নির্মল্য তালুকদার মূলত 'বঙ্গবন্ধু পরিষদ, অস্ট্রেলিয়া'-এর সাধারণ সম্পাদক এবং 'অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি'

এএফইআরএমবি-এর আন্তর্জাতিক তৎপরতা কেবল প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাথে দেশীয় সংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততাও পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এএফইআরএমবি আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে আলোচক হিসেবে যুক্ত হন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত পেশাজীবী হিসেবে পরিচিত অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। রানা দাশের সংগঠনের তৈরি করা বিভ্রান্তিকর রিপোর্টগুলোই এএফইআরএমবি-এর ওয়েবসাইটে প্রচার করা হয়।

রানা দাশগুপ্ত ও তার সংগঠন আওয়ামপন্থী হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে Firstpost-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।"

সাক্ষাৎকারে তিনি বিরোধী দল বিএনপি-কে ভারতের ‘বিজেপি’-র সাথে তুলনা করে হিন্দুদেরকে কেবল আওয়ামী লীগকেই ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

 

 

একই সিম্পোজিয়ামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তী তাঁর ওপর সংঘটিত ‘মব অ্যাটাক’ এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরেন। যদিও পরবর্তীতে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একটি হত্যা মামলার আসামি হওয়ার কারণে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতেই মূলত তাঁর পদোন্নতি বোর্ড স্থগিত করা হয়েছিল, যেটিকে তিনি ‘মব অ্যাটাক’ বলে অভিহিত করেছেন।

ড. কুশল বরণ চক্রবর্তীর সাথে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি এবং দেশটির কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভারতের একাধিক মন্ত্রী ছাড়াও ২০২১ সালে ভারতের গোরক্ষপুরে তিনি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মুসলিম-বিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য বহুল সমালোচিত এই নেতাকে ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কুশল।

 

বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে বয়ান তৈরি

এএফইআরএমবি ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি ওপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও পরিসংখ্যানের আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটের 'Reports and Publications' বিভাগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে চারটি প্রতিবেদন/রিপোর্ট ওয়েবসাইটে পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবেদনে অসত্য, অপ্রমাণিত এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘুদের ওপর জাতিগত নিধন হচ্ছে’ বলে অসত্য বয়ান প্রচার করা হয়েছে। 

সংগঠনটির ওয়েবসাইটে থাকা রিপোর্ট চারটি হচ্ছে:

১. BHBCUC Minority Report: হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ১৩৫ পৃষ্ঠার বিতর্কিত রিপোর্ট (৪-২০ আগস্ট ২০২৪), এই প্রতিবেদনে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিকে হিন্দুদের ওপর ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। 

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উক্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত অন্তত নয়জন হিন্দু ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের সাথে সাম্প্রদায়িক কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি; যা এএফইআরএমবি-এর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

২. BHBCUC Report (Jan-Jun 2025): ঐক্য পরিষদের ২০২৫ সালের আপডেট রিপোর্ট, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে "চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতা"-র অভিযোগ আনা হয়েছে। 

 

 

তবে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে, এই রিপোর্টের প্রায় প্রতিটি বড় দাবিই অতিরঞ্জিত বা তথ্যগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ

৩. CHT Annual Report 2024: পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মানবাধিকার রিপোর্ট।

৪. The Erasure of Minorities: এটি মূলত 'The Australia Today'-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধ যা সংগঠনটির পরিচালক আমল দত্ত লিখেছেন এবং তাতে দাবি করেছেন, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো 'জাতিগত নিধন' চালানো হচ্ছে সংখ্যালঘুদের ওপর।

এছাড়াও তাদের ওয়েবসাইটে জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলন এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর সারাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর 'নারকীয় হামলা' ও 'ধর্ষণের' মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দুর্গাপূজায় সরকারিভাবে 'নিষেধাজ্ঞা' আরোপ করা হয়েছিল বলেও তারা দাবি করে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুর্গাপূজায় নিষেধাজ্ঞার দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন; বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি বরাদ্দ ও ছুটি ঘোষণা করেছিল। 

এএফইআরএমবি তাদের ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশে সংঘটিত সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়াকেও তারা ‘সাম্প্রদায়িক বৈষম্য’ বা ‘বুদ্ধিবৃত্তিক নিধন’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। 

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল বারকাতকে ২৯৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও, এএফইআরএমবি বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে।

 

 

AFERMB ড. বারকাতের বিরুদ্ধে আনা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের উল্লেখ না করে বরং অসত্যভাবে তার উগ্রবাদবিরোধী গবেষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে একে একটি 'বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্য' গ্রেপ্তার হিসেবে দাবি করে।

যদিও জনতা ব্যাংকে অধ্যাপক বারাকাতের দুর্নীতির বিষয়টি শেখ হাসিনা সরকারের সময়েও আলোচিত ছিল। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮ সালে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, "জনতা ব্যাংক দেশের একটা সেরা ব্যাংক ছিল, কিন্তু আবুল বারকাত এটাকে শেষ করে দিয়েছে।"

একই প্রবণতা দেখা গেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রন্টু দাশ ও ড. কুশল বরণ চক্রবর্তীর অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনার ক্ষেত্রেও। সংগঠনটি দাবি করেছে, সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে তারা ‘কট্টরপন্থি মবের’ লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। 

তবে সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের জোড়া ছাত্র খুন মামলার আসামি হওয়া এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ন্যূনতম জিপিএ ছাড়াই নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে শিক্ষক হওয়ার কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা রন্টু দাশকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সহসভাপতি এই রন্টু দাশকে পরবর্তীতে দলীয় প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিধিমালা (এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৩.০ থাকার নিয়ম) লঙ্ঘন করে, মাত্র ২.৯ জিপিএ থাকা সত্ত্বেও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

একইভাবে, ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলার একজন আসামি হওয়ার কারণেই মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাঁর পদোন্নতি বোর্ড স্থগিত করার দাবি তুলেছিল। অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের দায়কে এএফইআরএমবি ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন হিসেবে তুলে ধরছে।

 

এএফইআরএমবি-এর তৎপরতা

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুকে আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারকদের কাছে তুলে ধরতে এএফইআরএমবি একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর সুমন সাহার সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সংগঠনটি একদিকে যেমন অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে তথ্য সরবরাহ এবং প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে 'কট্টরপন্থীদের উত্থান' সংক্রান্ত বয়ান প্রচার করছে।

সিডনিতে আয়োজিত ধারাবাহিক বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে তারা ‘সিস্টেমেটিক এথনিক ক্লেনজিং’ বা পদ্ধতিগত জাতিগত নিধনের অভিযোগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে 'মব ভায়োলেন্স'-এর দাবি আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরছে। এই প্রক্রিয়ায় রানা দাশগুপ্ত ও ড. কুশল বরণ চক্রবর্তীর মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদেরও সম্পৃক্ত হতে দেখা গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নিবন্ধিত হওয়ার ১২ দিন পর, ১৭ আগস্ট সিডনির টাউন হলে ২৩টি সংগঠনের সমন্বয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে এএফইআরএমবি। সমাবেশে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘সিস্টেমেটিক এথনিক ক্লেনজিং’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন পার্লামেন্টে দেওয়া এক ভাষণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কিছু পরিসংখ্যান এবং সংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দের বাড়িতে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন।

 

 

যদিও রাহুল আনন্দের বাড়িতে আগুনের ঘটনার বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক ছিল না; বরং বিক্ষুব্ধ জনতা ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২-এ অবস্থিত বঙ্গবন্ধু মিউজিয়ামে যে আগুন দেয়া তার প্রভাবে সংলগ্ন ভবন হওয়ার কারণেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে (রাহুল আনন্দের) বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সংসদে তার ভাষণে মন্ত্রী ক্রিস আরও জানান, কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর সুমন সাহা এবং ৪৬ জন কমিউনিটি নেতার একটি অনলাইন ব্রিফিং থেকে তিনি এই তথ্যগুলো পেয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সুমন সাহা মূলত এএফইআরএমবি নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। 

অস্ট্রেলিয়ার নীতিনির্ধারকদের সাথে এএফইআরএমবি-এর এই যোগাযোগের আরও প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ পশ্চিম সিডনির এক সভায়। এএফইআরএমবি-এর উদ্যোগে আয়োজিত সেই সভায় প্রধান সঞ্চালক ছিলেন সুমন সাহা এবং অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন ও ফেডারেল মেম্বার অ্যান্ড্রু চার্লটন।

সভায় ‘নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের’ জন্য মানবিক ভিসা সম্প্রসারণ এবং ইমিগ্রেশন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

 

 

২০২৫ সালের ৪ জুলাই মার্টিন প্লেসে আয়োজিত আরেকটি বিক্ষোভে সংগঠনটির পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ‘মব ভায়োলেন্স’-এর অভিযোগ আনা হয়। এর ৩ দিন পর, ৭ জুলাই সিডনির হিন্দু ভবনে সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল বিরোধীদলীয় নেতার ছায়া সহকারী মন্ত্রী সিনেটর মারিয়া কোভাচিচের (Senator Maria Kovacic) সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে। সেখানে তারা চিন্ময় দাসকে ‘মানবাধিকার কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করে তার মুক্তি দাবি করে।"

এএফইআরএমবি আন্তর্জাতিক মহলে চিন্ময়কে একজন ‘নির্যাতিত মানবাধিকার কর্মী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে খোদ সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যেই বিতর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ‘সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ দায়ে তাকেসহ আরও কয়েকজনকে ইসকনের যাবতীয় কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কেবল সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গই নয়, শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসকনের আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা কার্যালয় (CPT) চিন্ময় দাসের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

 

 

ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী সংবাদ সম্মেলনে জানান, বহিষ্কৃতদের কোনো কর্মকাণ্ডের দায়ভার ইসকন নেবে না। ২০২৪ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামে একটি সমাবেশের সময় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আয়োজক সংস্থা 'ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল' (IPDC)-এর সাথে ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ফেসবুক পেইজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, রানা দাশগুপ্ত এই মুহূর্তে অসুস্থ আছেন। তাদের সংগঠনের সাথে AFERMB-এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হলেও, আজহারী ও আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, রানা দাশগুপ্তের সাথে কথা বলে পরবর্তীতে এর উত্তর দেওয়া হবে। 

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। 

এছাড়া, ড. কুশল বরণ চক্রবর্তীর ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।