হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পুরো মনোযোগ হাম নিয়ে। কিন্তু এরই মধ্যে অনেক সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ম্যালেরিয়ায় একজন সচিবের মৃত্যুর পর জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে নতুন করে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে নতুন করে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। বেড়েছে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যুর সংখ্যা। আর এসব তথ্য বলে দেয় বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে বাংলাদেশের অন্য সব সেক্টরের মতো স্বাস্থ্য খাতও যে এখন বিপর্যস্ত, তার প্রমাণ এসব পরিসংখ্যান। দেড় বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা রীতিমতো ভেঙে পড়েছে। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন তার বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ নূরজাহান বেগমকে।
নূরজাহান বেগম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে ইউনূস যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন জোবরা গ্রামে গ্রামীণ পাইলট প্রকল্প শুরু করেন তখন নূরজাহান বেগম তাতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। খুব দ্রুতই ইউনূসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। এরপর থেকে নূরজাহান বেগম ইউনূসের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত। ব্যাংকিং সেক্টরে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ইউনূস তাকে দীর্ঘদিন গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। ইউনূসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। নূরজাহান বেগমের দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মুহাম্মদ তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে ৬৫০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলে তুহিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিগত কর্মকর্তার (পিও) দুর্নীতির দায় কি উপদেষ্টা এড়াতে পারেন? উপদেষ্টার যোগসাজশে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়েছে বলেই অনেকে মনে করেন।
কিছুদিনের মধ্যেই এটি প্রমাণিত হয় যে, নূরজাহান বেগম অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চালানোর ন্যূন?তম যোগ্যতা তার নেই। তখনো ইউনূস তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেননি। বরং তাকে সহযোগিতার জন্য সায়েদুর রহমানকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আসার পর দুর্নীতি আরও বেড়ে যায়। ইউনূস সরকার ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রেখেছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ অর্থ কোথায় খরচ হলো তার কোনো হদিস নেই। এ সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় যে অপরাধটি সংগঠিত হয়েছে তা হলো ইপিআই কর্মসূচি বন্ধ করা। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করে বাংলাদেশ সরকার। পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচিটি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের কাছে ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। এটি বাস্তবায়ন করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি) তথা বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে খাদ্য-পুষ্টি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদানসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা, জনবল নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এতদিন সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো। এতে টিকা কিনতে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হতো না এবং সময়ও তুলনামূলকভাবে কম লাগত। জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে নিজেরা টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ইউনূস এবং নূরজাহানের দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। কারণ ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনলে দুর্নীতি করার সুযোগ থাকত না। দফায় দফায় বৈঠক শেষে ২০২৫ সালের মার্চে সেক্টর প্রোগ্রামগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে টিকা কেনার পদক্ষেপ নিতে গেলে তাতে প্রশ্ন তোলে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে দর কষাকষির এক পর্যায়ে ইউনিসেফকে আবারও টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে কয়েক মাস পার হয়ে যায়। এ ছাড়া অর্থছাড়, হিসাব নিরীক্ষাসহ অন্যান্য কাজে আরও সময় গেলে যায়।
এগুলো করতে গিয়ে প্রায় ছয় মাস টিকা কেনা বন্ধ থাকায় ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে বিভিন্ন জেলায় শিশুদের টিকার সংকট দেখা দেয়। তখন একাধিকবার টিকাকেন্দ্র গিয়েও শিশুকে টিকা দিতে পারেননি অভিভাবকরা। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করার কারণে দেশে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইডসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচিও বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশ এখন এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। ইপিআই কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার কারণে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের রোগঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় শিশুদের যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি (নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস), হাম এবং রুবেলাসহ মোট ১২টি সংক্রামক রোগের টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হতো। এসব রোগ প্রতিরোধ করতে না পারার কারণে আবারও ফিরে এসেছে এসব মরণব?্যাধি। আমরা এখন শুধু হাম নিয়ে ব্যস্ত আছি। কিন্তু এসব রোগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুধু এই ১২টি রোগে নয়, দেশে নতুন করে জলাতঙ্ক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও বেড়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জনে পৌঁছেছে।
আর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর এ ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কুকুরের টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে। ফলে প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ৪২ জন মানুষের। ২০২৪ সালে ৫৮ জনের, ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। বর্তমান সরকার গতকাল ২০ এপ্রিল থেকে হামের টিকা দান কর্মসূচি শুরু করেছে। কিন্তু এর আগেই ইউনূস সরকারের সীমাহীন লোভ আর অযোগ্যতার কারণে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে তিন শতাধিক শিশু। হামের থাবায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নাকি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা? বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশক ধরে টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে সাফল্য ও গর্বের গল্প লিখেছিল। একসময় যেখানে মাত্র ২ শতাংশ শিশু পূর্ণ টিকা পেত, সেখানে সেই হার ৯০ শতাংশের ওপরে তোলা হয়েছিল। এ সাফল্য কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি লাখ লাখ শিশুর বেঁচে থাকার গল্প। অথচ আজ, সেই দেশেই হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ, মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। এটা ইউনূস সরকারের ব্যর্থতার একটা বড় উদাহরণ। তবে এখন শুধু হাম নয়, ইউনূস সরকারের গাফিলতির কারণে অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁঁকি বেড়েছে। আমাদের গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থাই এখন হুমকির মুখে। সরকার হামের টিকা দেওয়া শুরু করেছে, এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু হামের পাশাপাশি অন্য সংক্রামক রোগের টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে হবে দ্রুত। তা না হলে বাংলাদেশ শিশুদের জন্য এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে। যার জন্য দায়ী ইউনূস, নূরজাহান এবং অন্তর্বর্তী সরকার।