সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত সব কমিটি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। নিষ্ক্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে তরুণ, ত্যাগী ও সাহসী নেতৃত্বকে সামনে আনার পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে সব মহানগর ও জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। সামনে জাতীয় কাউন্সিল ও বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দলকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। তাই এখন পুনর্গঠনই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপাতত সরকারের কার্যক্রম পরিচালনাই শীর্ষ নেতৃত্বের অগ্রাধিকার হলেও, দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর এবার দল পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করায় মনোযোগ দিয়েছে দলটি।
গুলশানে গতকাল (শনিবার) রাতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, কোরবানির ঈদের পর চলতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে কাউন্সিল করার প্রস্তুতি চলছে। এই কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতে, নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকের পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত করে দ্রুত কাউন্সিলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কাউন্সিল আয়োজন করতে আমাদের অন্তত কয়েক মাস সময় লাগবে।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিলের আগেই স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণের সম্ভাবনা রয়েছে। আলোচনায় রয়েছে, খন্দকার মোশাররফ হোসেন বা আব্দুল মঈন খানের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা রাষ্ট্রপতি বা সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে গেলে স্থায়ী কমিটিতে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দলের সাংগঠনিক পদে না থাকায় নতুন নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থায়ী কমিটি বিএনপির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে বিবেচিত। এখানে সাধারণত পরীক্ষিত, ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাচন কৌশল নির্ধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি প্রণয়নে এই কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় অভ্যন্তরীণ আলোচনায় জানা গেছে, সম্ভাব্য নতুন স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবদিন, জয়নুল আবদিন ফারুক, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিবুন নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে।
পরিবর্তন আসতে পারে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণেও
ঢাকা মহানগর উত্তরের বর্তমান আহ্বায়ক আমিনুল হক সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তিনি আগের মতো সংগঠননের কাজে সময় দিতে পারছেন না। তাই আহ্বায়ক পদে পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে নতুন সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতা মামুন হাসান। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন ও সাবেক কমিশনার আনারুজ্জামান আনোয়ার।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু বর্তমানের ফেনীর একটি আসনের সংসদ সদস্য, যার ফলে তিনিও আগের মতো সময় দিতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে নতুন সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হাবিবুন নবী খান সোহেল। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম ও ফরহাদ হোসেন।
সব মিলিয়ে, জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিএনপি নতুন উদ্যমে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দলীয় নেতারা মনে করছেন।