দেশের সীমানা পার হয়ে কোথাও যেতে হলেই সবার আগে প্রয়োজন একটি ডকুমেন্ট—পাসপোর্ট। ছোট্ট নোটবুক আকারের এই পরিচয়পত্র নিজ দেশের বাইরে আমাদের পরিচয় বহন করে। আধুনিক পাসপোর্টের এই রূপ আসতে অনেকটা সময় লেগেছে। তবে ‘পাসপোর্ট’, বা এই ধরনের ডকুমেন্টের প্রচলনের শুরু প্রাচীন সময়ে।
প্রাচীন চীন কিংবা রোমান সাম্রাজ্যের টাইমলাইনে নজর দিলে দেখা যায়, সে সময় পাসপোর্টের মতো ডকুমেন্ট দেওয়া হতো ভ্রমণকারী এবং ব্যবসায়ীদের। অন্য অঞ্চলে গিয়ে যাতে করে তারা নিজেদের পরিচয় দিতে পারেন এবং বোঝাতে পারেন যে তাদের উদ্দেশ্য ক্ষতিকর কিছু নয়, তারা ওই দেশের জন্য নিরাপদ। লাতিন শব্দ পাসার (passer) এবং পোর্টাস (portus) জুড়েই পাসপোর্ট শব্দের উদ্ভব।
রাজা অষ্টম হেনরির শাসনামল, সময়টা ১৫৪০ সাল। বলা যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাসপোর্টের কাজ শুরু হলো। ইংলিশ প্রিভি কাউন্সিল ট্রাভেল ডকুমেন্ট প্রদান শুরু করে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নিয়মকানুন প্রচলন ছিল এ বিষয়ে। তবে আধুনিক পাসপোর্টের শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯২০ সালে। লিগ অব নেশনসের দেশগুলোর মধ্যে একরকম চুক্তির ফলে পাসপোর্ট হয়ে উঠল বিদেশ ভ্রমণের অত্যাবশ্যক ডকুমেন্ট। আর একই সঙ্গে, মানুষের চলাফেরাকে সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত করার এক হাতিয়ারও হয়ে উঠল এটি।
প্রাচীন ভ্রমণ অনুমতিপত্র
আগে প্রতিটি দেশ বা রাজ্যের সীমানার নিরাপত্তা বা ভাগবাঁটোয়ারা এখনকার সময়ের মতো ছিল না। সীমান্ত পেরিয়ে মানুষজনের যাতায়াতও সে কারণে অবারিত ছিল। প্রাচীন চীনে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘গোওসৌ’ নামে একটি ব্যবস্থা ছিল। এটি খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৫–২২১ এর সময়ে চালু ছিল। হান রাজবংশের সময় (খ্রিস্টপূর্ব ২০২–খ্রিস্টাব্দ ২২০) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের ভেতরে মানুষ ও পণ্যের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হতো।
সিল্ক রোড চালু হওয়ার পর এই ব্যবস্থায় ভ্রমণকারীদের অনুমতিপত্র বহন করতে হতো। এর মধ্যে তাদের পরিচয়, গন্তব্য এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য বিস্তারিত উল্লেখ করতে হতো। এর মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় উদ্দেশ্য ঠিকঠাক নিশ্চিত করেই তারা বিভিন্ন চেকপয়েন্ট অতিক্রম করার অনুমতি পেতেন। এই পরিচয়পত্রে কাঠের ওপর খোদাই করে লেখা থাকত, যার ব্যবহার অনেকটাই এখনকার সময়ের ভিসা-পাসপোর্টের মতো ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন।
রোমান সাম্রাজ্যের সময় সরকারি ভ্রমণকারীদের দেওয়া হতো ট্র্যাক্টোরিয়াম বা এক ধরনের চিঠি। সম্রাটের নাম দিয়ে ইস্যু করা এই চিঠি যাত্রাপথে তাদের সহায়তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করত বলে উল্লেখ করেন গবেষকরা। এই নথিগুলো বহনকারীদের পরিচয়ের প্রমাণের পাশাপাশি সম্রাটের অনুমোদনের স্বীকৃতি হিসেবেও কাজ করত।
‘সেফ কন্ডাক্ট’ কী?
আধুনিক পাসপোর্ট যার হাত ধরে এসেছে, সেটিকে বলা হয় ‘সেফ কন্ডাক্ট’। মধ্যযুগের এই নথি ‘গুইডাটিকেম’ বা ‘সাউফ কনডুইট’ নামেও পরিচিত ছিল। এতে উল্লেখ করা থাকত বহনকারীর নাম এবং ভ্রমণের বিস্তারিত উদ্দেশ্য। রাজা বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এগুলো ইস্যু করত, যাতে ভ্রমণকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
মধ্যযুগীয় আরাগো-কাতালোনিয়ায় গুইডাটিকেম খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রমণ ও বাণিজ্য সহজ করত। একইভাবে মধ্যযুগীয় ফ্রান্সে সাউফ কনডুইট কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য ইস্যু করা হতো। ইংল্যান্ডে রাজা পঞ্চম হেনরির শাসনামলে ১৪১৪ সালের একটি পার্লামেন্ট আইনে সেফ কন্ডাক্টের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে, এই নথিগুলো কূটনীতির ক্ষেত্রে এবং কাগজে-কলমে শাসকের স্বাক্ষরের সুবাদে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিত। ১৫৪০ সালের দিকে অষ্টম হেনরির প্রিভি কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে পাসপোর্ট দেওয়া শুরু করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পুরোনো দিকের যে নিদর্শন পাওয়া যায়, তাতে রাজা প্রথম চার্লসের সই দেওয়া রয়েছে। তারিখ—১৮ জুন, ১৬৪১। ১৭৯৪ সালে ব্রিটেনে পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষমতা সেক্রেটারি অব স্টেটের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আধুনিক পাসপোর্ট—কবে, কীভাবে?
আধুনিক বৈশ্বিক পাসপোর্ট ব্যবস্থার ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন। ঐতিহাসিকভাবে আগেকার আমলের পাসপোর্ট আর আধুনিক পাসপোর্টের উদ্দেশ্য এবং কাজের খানিকটা পার্থক্য রয়েছে। আগেকার নথিগুলো ছিল বিভিন্ন স্থানে নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করা, আর আজকের আধুনিক পাসপোর্ট ব্যবস্থা এক হিসেবে দেখলে চলাচলকে নিয়ন্ত্রণও করে।
আধুনিক পাসপোর্ট ব্যবস্থার উত্থান ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯২০ সালে লিগ অব নেশনসের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে পাসপোর্টকে মানসম্মত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাওয়া সহজ করার জন্য নয়, বরং ভ্রমণ সীমিত করা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার উদ্দেশ্যেই এই পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছিল।
১৯৬৩ সালে জাতিসংঘের সামনে এই বাস্তবতা আসে যে একজন নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতা তার পাসপোর্ট প্রদানকারী রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। পাসপোর্ট বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী পাসপোর্ট বাতিলের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। অধিকাংশ দেশ এতে সম্মত হলেও যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ‘কারণ’ দেখিয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং পাসপোর্ট যেমন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ বা চলাফেরার ক্ষেত্রে অপরিহার্য, তেমনি এটি প্রতিটি মানুষের মুক্তভাবে চলাচলের ক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধ করে রাখা একটি নিয়ন্ত্রক।