Image description

দৈনিক কালের কণ্ঠ ২৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত “ইউনূস আমলে মুক্তিযোদ্ধা পীড়নের দেড় বছর: এত অপমানিত আগে হননি মুক্তিযোদ্ধারা” শিরোনামের এক প্রতিবেদনে দাবি  করেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে “বেছে বেছে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নিপীড়ন” চালানো হয়েছে এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা হওয়া’টাই এসব ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

প্রতিবেদনটির সঙ্গে প্রকাশিত গ্রাফিক্সে দেখানো হয়েছে, এই সময়কালে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা অন্তত ২৫টি, যাতে নিহত হয়েছে ২ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ জন। 

এসব ঘটনার পেছনের “কারণ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া, “প্রতিপক্ষ” হিসেবে দেখানো হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের এবং “উসকানি” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ ও ‘রিসেট বাটন’ ধারণা।

প্রতিবেদনটিতে ২০১৪-২০২৩ সালের ঘটনাগুলোকে ‘যাপিত জীবনের নানা ইস্যু’ হিসেবে দেখালেও, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ঘটনাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করার মিশন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

তবে দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রাফিক্সে ২৫টি ঘটনার কথা বলা হলেও মূল প্রতিবেদনে কেবল ২১টির বিবরণ রয়েছে। 

এই ২১টি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে কেবল 'মুক্তিযোদ্ধা' পরিচয়ের কারণে এসব হামলা সংঘটিত হয়নি; বরং ঘটনাগুলোর পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট  প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

ঘটনাগুলোর পৃথক বিশ্লেষণ: উপস্থাপনা বনাম প্রেক্ষাপট

প্রতিবেদনের শুরুতেই কালের কণ্ঠ রংপুরের তারাগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রীর হত্যাকাণ্ডকে “রহস্যঘেরা” ও সম্ভাব্য পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয়দের ভাষ্যে “স্বার্থান্বেষী মহল” জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

তবে কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনেই বলা হয়, অল্প টাকার ঋণ পরিশোধের জন্য লুটের উদ্দেশ্যে এক যুবক এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। 

এ বিষয়ে “ঋণ পরিশোধে টাকা লুট করতে মুক্তিযোদ্ধা ও স্ত্রীকে হত্যা: পুলিশ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে বিডিনিউজ। প্রথম আলোর সংবাদে যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে টাইলস লাগানোর কাজ করতে আসা একজনকে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি কালের কণ্ঠে “নজিরবিহীন অপমান” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এটি তার মুক্তিযোদ্ধা  পরিচয়ের কারণে ঘটেছে বলে ফ্রেম করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তবে ওই ঘটনায় যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, স্কুল কমিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বিরোধ ও প্রতিশোধের জেরেই এই ঘটনা ঘটে।

অর্থাৎ, আব্দুল হাই কানুর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় থাকলেও ঘটনার পেছনে স্থানীয় বিরোধের প্রেক্ষাপট ছিল। 

দিনাজপুরের খানসামায় মুক্তিযোদ্ধা শরীফ উদ্দিন সরকারের ওপর হামলা ও পরবর্তীতে মৃত্যুর ঘটনাটি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনেই উল্লেখ রয়েছে তিনি মূলত দলীয় কোন্দলের শিকার হন। স্থানীয়ভাবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এই ঘটনার পেছনে কাজ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, উপজেলা বিএনপির দুই পক্ষ মিয়া গ্রুপ ও কর্নেল গ্রুপের বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সকালের সময়ে প্রকাশিত সংবাদেও একই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ঘটনাটি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নয়, বরং দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। 

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশে টাঙ্গাইলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাড়িতে গভীর রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির নিজস্ব বিবরণেই স্বীকার করা হয়েছে যে, হামলাকারীদের মুখ বাঁধা এবং হেলমেট পরা ছিল। অর্থাৎ, কারা এই হামলা করেছে বা তাদের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, সে সম্পর্কে কালের কণ্ঠ নিজেও নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি। দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানেও এই ঘটনায় জড়িতদের নির্দিষ্ট কোনো পরিচয় বা উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।

প্রতিবেদনে শরীয়তপুরে মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ সিকদারের ওপর হামলার ঘটনাটি উল্লেখ থাকলেও, কালের কণ্ঠের একই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে জমিসংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এর সূত্রপাত হয়েছে।

ঢাকা মেইলে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, জমি মাপজোখকে কেন্দ্র করে বিরোধ, পরবর্তীতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রথম আলোর সংবাদেও এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অর্থাৎ, ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা হলেও ঘটনাটি মূলত জমির বিরোধকেন্দ্রিক।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম শামসুল আলমের বাড়িতে হামলার ঘটনা কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনেই স্পষ্টভাবে 'চাঁদাবাজি' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সন্ত্রাসী বিল্লাল হোসেন ও তার বাহিনী চাঁদা না পেয়ে এই হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। অর্থাৎ, এখানে হামলার কারণ 'মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়' নয়, বরং 'অর্থনৈতিক অপরাধ' বা চাঁদাবাজি।

ঘটনার প্রকৃত কারণ 

ঘটনার সংখ্যা

শতকরা হার (প্রায়)

জমি, সম্পত্তি ও সীমানা বিরোধ

১৯%

রাজনৈতিক কোন্দল ও পূর্ববর্তী ক্ষোভ

২৯%

ব্যক্তিগত শত্রুতা ও স্থানীয় বিরোধ

২৪%

চাঁদাবাজি ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য

১৪%

জুলাই আন্দোলনের মামলা (আইনি ব্যবস্থা)

৫%

ডাকাতি/ছিনতাই বা অজ্ঞাত কারণ

৯%

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা তরিকুল আলমের অপদস্থ হওয়ার ঘটনাকে কালের কণ্ঠ একটি একতরফা 'মুক্তিযোদ্ধা নিগ্রহ' হিসেবে তুলে ধরলেও, প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন।

প্রথম আলোর সংবাদ থেকে জানা যায়, এটি ছিল মূলত একটি পুলিশি সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক উত্তেজনা।

একাত্তর টিভির সংবাদে বলা হয়, তরিকুল আলম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে না মেলানোর আহ্বান জানালে সমাবেশে উপস্থিত জামায়াত নেতা লতিফুর রহমানসহ বিএনপি-জামায়াত ঘরানার নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদ জানান। 

অর্থাৎ, বিরোধের মূল জায়গাটি ছিল ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ব্যাখ্যা নিয়ে, তরিকুল আলমের 'মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়' নিয়ে নয়। খোদ জেলা পুলিশ সুপার বিষয়টিকে একটি 'অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলা' এবং 'বক্তার একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে অন্যদের দ্বিমত' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গুলিস্তানে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনাকে কালের কণ্ঠ 'পরিচয়ভিত্তিক নিগ্রহ' ও 'বিনা কারণে গ্রেপ্তার' হিসেবে চিত্রায়িত করেছে।

এখন টিভির সংবাদ অনুযায়ী, আব্দুর রহমান কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। তিনি ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যুবদল ও ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মী (রঞ্জু, লতিফ ও সুমন) নিহতের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ও চার্জশিটভুক্ত আসামি।

বাংলাট্রিবিউনের সংবাদ থেকে জানা যায়, আব্দুর রহমান বিক্ষোভের মাঝে হঠাৎ এসে বলেন, আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শেখ হাসিনা চলে আসবেন। বলেই ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেয়া শুরু করেন। এরপরই বিক্ষোভকারীরা তাকে বেধড়ক পিটুনি দেন। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে সিরাজগঞ্জের সেই হত্যা মামলায় সোপর্দ করে। অর্থাৎ, তার এই গ্রেপ্তার কোনো 'রহস্যজনক' বা 'উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বিষয় ছিল না, বরং তিনি একটি সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের অভিযুক্ত আসামি ছিলেন। 

কালের কণ্ঠ তাদের প্রতিবেদনে আব্দুর রহমানের এই রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার বিরুদ্ধে থাকা গুরুতর হত্যা মামলার তথ্যটি উল্লেখ না করে বিষয়টিকে কেবল 'স্লোগান দেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা নিগ্রহ' হিসেবে তুলে ধরেছে।

পরবর্তী অংশে “ইউনূস আমলের আরও ঘটনা” উল্লেখ করে একাধিক ঘটনা একত্রে তুলে ধরা হয়েছে। 

যশোরে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক মোল্লার বাড়িতে হামলার ঘটনাটি কালের কণ্ঠে চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম আলোর সংবাদ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের সঙ্গে চাঁদা দাবির বিষয়টি যুক্ত হয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ইন্ধনে হামলাটি সংঘটিত হয়; যা কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। দৈনিক কল্যাণ নামে একটি পোর্টালের সংবাদেও একই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছ।

বরগুনায় মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ মিয়াকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছনার ঘটনা কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম আলোর সংবাদ থেকে জানা যায়, তাঁকে হেনস্তাকারী ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে বিএনপি সম্পৃক্ত একটি পরিবারের সদস্য। সে সময় “মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করলেন বিএনপি নেতার ছেলে ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে চ্যানেল২৪।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে হামলাকারীর রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। 

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের ঝিলপাড়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রনাথ প্রামাণিককে তাঁর বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখমের ঘটনা কারা ঘটিয়েছে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আমাদের প্রতিদিন নামে একটি পোর্টালের সংবাদ অনুযায়ী, পুলিশি ভাষ্যমতে এটি ছিল একটি রহস্যজনক হামলা। ঘটনার সময় হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য বা পরিচয় উঠে আসেনি। ফলে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও একে 'মুক্তিযোদ্ধা নিগ্রহ' হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ভাঙচুরে বাধা দিতে গিয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার  নাসির মিয়া লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা কালের কণ্ঠে উল্লেখ করা হলেও সেখানে ঘটনার প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।

ইত্তেফাকের সংবাদ অনুযায়ী, বন্দর থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে প্রবেশ করে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণ ও ভাঙচুর করে এবং এ সময় বাধা দিতে গেলে নাসির মিয়াকে লাঞ্ছিত করা হয়। যুগান্তরের সংবাদেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ঘটনাটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। 

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মুক্তিযোদ্ধা চাষি আব্দুর রহমানকে মারধরের ঘটনা কালের কণ্ঠে উল্লেখ করা হলেও সেখানে ঘটনার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করা হয়নি।

আজকের পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী, চাষি আব্দুর রহমান স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি। হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত না হলেও স্থানীয়দের মতে পূর্বশত্রুতার জেরেই এই হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আমাদের সময়ের সংবাদেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

টাঙ্গাইলের সখীপুরে মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব খানকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি কালের কণ্ঠে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম আলোর সংবাদ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী আইয়ুব খান স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মিছিলে হামলার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হন। মামলাটি দায়ের করেন ছাত্রদল সম্পৃক্ত একজন নেতা, যা কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। বিষয়টি দেশ রূপান্তরের সংবাদেও উল্লেখ করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মুক্তিযোদ্ধা মুছা মিয়ার উপর হামলার ঘটনা কালের কণ্ঠে চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমার সংবাদের প্রকাশিত সংবাদ অনযায়ী, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নিয়মিত চাঁদা দাবি করছিল এবং তা না দেওয়ায় মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় একটি পোর্টালের সংবাদেও উল্লেখ করা হয়েছে।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের ওপর হামলার ঘটনাটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও, কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনেই জমিসংক্রান্ত বিরোধকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আমাদের প্রতিদিন নামের পোর্টালের সংবাদে জানা যায়, দীর্ঘদিনের পারিবারিক জমি বিরোধ ও দখলচেষ্টাকে কেন্দ্র করে হামলাটি সংঘটিত হয়। পুলিশও এটিকে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের হিসেবে উল্লেখ করেছে। বার্তা২৪ এর সংবাদেও এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

রাজধানীর উত্তরায় সাবেক সিইসি কে এম নূরুল হুদাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও কালের কণ্ঠে শুধু “মবের হাতে লাঞ্ছিত” এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে সামনে রেখে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ঢাকা টাইমসের সংবাদে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া নির্বাচন সংক্রান্ত অনিয়ম ও অন্যান্য অভিযোগে বিএনপি মামলা করে। আগের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার জেরেও তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। স্থানীয় জনতা তাঁকে আটক করে জুতার মালা পরিয়ে পরে পুলিশে সোপর্দ করে। কিন্তু এই বিষয়গুলো কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে উল্লেখ না করে শুধু মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে সামনে আনা হয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ জুন “নুরুল হুদাকে ‘জুতার মালা’ পরাল জনতা” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ। তখন সেই সংবাদের কোথায়ও নুরুল হুদাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরেনি কালের কণ্ঠ।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা কালের কণ্ঠে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্লোবাল নিউজ বিডি পোর্টালের সংবাদে জানা যায়, মূলত বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবি, স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমার সংবাদ পোর্টালের সংবাদেও এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে এস এম শাহাদুল ইসলামকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা কালের কণ্ঠে রাজনৈতিক তর্কের জেরে “মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছনা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলার আলোতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী এস এম  শাহাদুল ইসলাম স্থানীয় বিএনপি নেতা। জামায়াত কর্মীর সঙ্গে পারস্পরিক রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের জেরেই এই সংঘাতের সৃষ্টি হয়। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। দেশ রূপান্তরের সংবাদেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের কিল্লারপুল এলাকায় মৃত মুক্তিযোদ্ধা মোক্তার হোসেন মিন্টুর বাড়ি দখলচেষ্টার ঘটনা কালের কণ্ঠে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় একটি গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায়, মূলত দীর্ঘদিনের সম্পত্তি দখলচেষ্টা, ভাড়াটিয়াদের হুমকি, পূর্ববর্তী বিরোধ এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী হামলার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে এই ঘটনা ঘটেছে।। স্থানীয় একটি অনলাইন পোর্টালের সংবাদেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

সবশেষে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী তালুকদারের চলাচলের পথে বাধা দেওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় একটি গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায় ব্যক্তিগত জমি ও পথ-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। যেখানে চলাচলের পথে তালা লাগিয়ে দেওয়ায় তিনি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির সমাধান হয় এবং পথ খুলে দেওয়া হয়।

ঘটনাগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো হামলাতেই 'মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়' মূল কারণ ছিল না; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই জমিজমা, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক কোন্দলের মতো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট কাজ করেছে। 

তা সত্ত্বেও কালের কণ্ঠ এই ঘটনাগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের 'টার্গেটেড হামলা' এবং 'স্বাধীনতাবিরোধীদের কাজ' হিসেবে ফ্রেম করে ন্যারেটিভ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনটিতে 'প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার' অভিযোগ তোলা হলেও, তাদের নিজেদের বক্তব্যেই স্পষ্ট স্ববিরোধিতা রয়েছে।

উল্লেখিত ২১টির মধ্যে অন্তত ৮টি ঘটনাতেই মামলা, গ্রেপ্তার, তদন্ত বা মীমাংসার মতো আইনি ব্যবস্থার কথা কালের কণ্ঠ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এছাড়াও অন্যান্য ঘটনাগুলোর মধ্যে এই ৮টিসহ মোট ১৪টি ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পুলিশ ও প্রশাসনের এসব আইনি পদক্ষেপ ও হস্তক্ষেপ স্বত্তেও ঘটনাগুলোকে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট বা প্রশাসন-সমর্থিত 'মিশন' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মূলত ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটা হামলা, আক্রমণ ও অপরাধমূলক ঘটনাকে একটি একরৈখিক ছাঁচে ফেলে উপস্থাপন করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।