দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতের ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ সময় বহু গ্রাম লন্ডভন্ড হয়েছে। গাছপালা ও ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে অসংখ্য গ্রাম লন্ডভন্ড হয়েছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ঘরচাপা ও শিলের আঘাতে পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রকিব হায়দার। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হওয়া ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে পাঁচ উপজেলার শত শত বসতবাড়ি ভেঙে গেছে। পাশাপাশি হাজার হাজার বিঘা জমির উঠতি ফসল, বিশেষ করে ভুট্টা ও তামাকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাতের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আদিতমারী উপজেলায়। পাশাপাশি পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা, দলগ্রাম ও সদর উপজেলার অসংখ্য গ্রামে শত শত বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার বিঘা জমির ভুট্টা ও তামাকের খেত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিলাবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের ভুট্টা, মরিচ, আলু, ধান খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানেই ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ঝোড়ো বাতাসসহ শিলাবৃষ্টির তীব্রতায় বহু বসতবাড়ির টিনের চাল ফুটো হয়েছে। রাতের অন্ধকারে এমন ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাসিন্দারা। ঘরের ভিতরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেকে বিপাকে পড়েন। স্থানীয়রা জানান, গত ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে এত তীব্র শিলাবৃষ্টি তারা দেখেননি। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের চণ্ডীমারী ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাইদুল ইসলাম জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝড়ে তার বসতবাড়ি ভেঙে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। প্রাণে বাঁচতে তারা মাটিতে শুয়ে পড়েন। এ সময় তার মা চোখে আঘাত পান। হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নের তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার ভুট্টা খেত মাটিতে শুয়ে গেছে। হাতীবান্ধা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা উত্তম কুমার নন্দি জানান, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতির খোঁজ নিচ্ছেন। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার জানান, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করা হবে।
ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আরও চারজন মারাত্মক আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার খড়িবাড়িয়া গ্রামের মাঠের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, খড়িবাড়িয়া গ্রামের প্রকাশ বিশ্বাসের ছেলে অপু বিশ্বাস ও সুনীল বিশ্বাসের ছেলে সমীর বিশ্বাসসহ চার কৃষক জমিতে পিঁয়াজ তোলার কাজ করছিলেন। তখনই হঠাৎ বজ্রপাত হয় এবং এতে চয় কৃষক গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক অপু বিশ্বাস ও সমীর বিশ্বাসের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। খড়িবাড়িয়া গ্রামের বিষ্ণু কুমার জানান, বজ্রপাতে তারা আহত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য শৈলকুপা হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা এবং বাকি চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
রংপুর : ঝড়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া বিদ্যুতের লাইনে স্পৃষ্ট হয়ে কাজলী বেগম (৫০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ৬টার রংপুর নগরীর বাহারকাছনা রামগোবিন্দ বাঙ্গীটারী এলাকার বাড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এসময় পরিবারের আরও চার সদস্য আহত হয়েছেন। নিহত কাজলী বেগম ওই গ্রামের চা বিক্রেতা সাইফুল ইসলামের স্ত্রী। স্থানীয় সিটি পুলিশ রফিকুল ইসলাম জানান, শুক্রবার রাতে রংপুর নগরীতে শিলাবৃষ্টিসহ ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এতে সাইফুল ইসলামের বাড়ির বিদ্যুতের মিটারের একটি তার ছিঁড়ে টিনের ঘরে লেগে থাকায় পুরো বাড়ি বিদ্যুতায়িত হয়ে থাকে। সকালে সাইফুলের স্ত্রী কাজলী বেগম নামাজ পড়ার জন্য ঘরের দরজা স্পর্শ করলে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধারে স্বামী সাইফুল, কিশোরী কন্যা সাবরিনা, ভাসুর হাফিজুল ইসলাম ও ভাবী রত্না বেগমও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত হন। এ সময় স্থানীয়রা ছুটে এসে গুরুতর আহত কাজলী বেগমকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। জানা গেছে, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত থেমে থেমে অস্থায়ীভাবে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে শিলাবৃষ্টির কারণে ভুট্টা-ধান ও শাকসবজির খেতসহ উঠতি ফসলের ক্ষতির শঙ্কা বেশি। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত জেলায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ে আকস্মিক ঝড়ে গাছ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়ে চাকাতি বালা (৭০) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চাঁনপাড়া এলাকায় এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ ছাড়া, উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের ঘাটিয়ারপাড়া এলাকায় ঝড়ের সময় বসতঘরের ওপর পাশের চারতলা নির্মাণাধীন বাসার দেয়াল ধসে ময়নুল ইসলাম (৫০) ও তার স্ত্রী খুকুমণি (৩৮) আহত হয়েছেন। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার আটোয়ারী এবং বোদা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার রাত প্রায় ১২টার দিকে হালকা বৃষ্টিপাত শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের তীব্রতা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে শুরু হয় বজ্রপাত। ঝড় ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসময় চাকাতি বালা নিজ বসতঘরে একাই অবস্থান করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়ার তোড়ে বাড়ির পাশে থাকা একটি বড় ‘সড়কজিয়া’ গাছ হঠাৎ উপড়ে গিয়ে সরাসরি ঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে ঘরটি মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং চাকাতিবালা গাছের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ না পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহতের ছেলে হরেণ চন্দ্র বলেন, ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে গাছটি পড়ার পরপরই আমরা কেউ ঘর থেকে বের হতে পারিনি। ঝড় থামার পর গিয়ে দেখি মা গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন। পরে তার লাশ উদ্ধার করি।
ব্যাপক ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার বোদা ও আটোয়ারী উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর, ধামোর, বলরামপুর, তোড়েয়া, নোদা উপজেলার সদর, ঝলইশালশিড়ি, ময়দানদিঘি, বেংহারী, চন্দনবাড়ি এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়েছে কয়েকটি গ্রাম। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে উড়ে গেছে টিনের চালা, ফুটো হয়েছে টিন, ভেঙে গেছে গাছপালা, নষ্ট হয়েছে একর একর জমিতে থাকা লাউ, ভুট্টা, মরিচ, বাদাম বোরোসহ নানা ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে । এসময় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়।
নওগাঁ : নওগাঁর পত্নীতলায় বজ্রপাতে আশরাফুল (৩৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। আশরাফুল উপজেলার ১১ নম্বর শিহাড়া ইউনিয়নের শীতল গ্রামের মৃত আয়নাল হকের ছেলে। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন। গতকাল ভোর ৪টার দিকে উপজেলার শিহাড়া ইউনিয়নের শীতল (তেপুকুরিয়া) মাঠে গমের খেতে এ ঘটনা ঘটে। শিহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ভোর ৪টার দিকে আশরাফুলসহ একই গ্রামের পাঁচজন কৃষক মাঠে গম কাটতে যান। এ সময় বজ্রপাতে তারা আহত হন। বজ্রপাতের মূল অংশ আশরাফুলের ওপর পড়ায় তিনি গুরুতর আহত এবং অন্যরা সামান্য আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আশরাফুলের মৃত্যু হয়।
মাগুরা : মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার দুর্গাপুর মাঠে পিঁয়াজ তোলার সময় গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বজ্রপাতে সুরুজ হোসেন (৩০) নামে এক দিনমজুর নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায়। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহির মিয়া জানান, দুর্গাপুর মাঠে সুরুজ হোসেন পিঁয়াজ তুলছিলেন। এ সময় বজ্রপাতে তিনি আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।