Image description
♦ চাপে বাংলাদেশের বাণিজ্য ♦ নতুন ফুয়েল সারচার্জে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়ার শঙ্কা ♦ পোশাক খাতসহ শিল্পে চাপ

জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাপী কনটেইনার শিপিং লাইনগুলো ভাড়া বাড়ানো শুরু করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অপারেটর অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে ব্যয়চাপ তৈরি হয়েছে।

শীর্ষ কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি ওশান নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস তাদের প্রধান বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটে ইমারজেন্সি ফুয়েল সারচার্জ চালু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমন সময়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন আগেই উচ্চ ভাড়া ও দীর্ঘস্থায়ী সাপ্লাই-চেইন সংকটে রয়েছে আমদানি-রপ্তানি খাত। কোম্পানির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন সারচার্জ শুকনা ও রেফ্রিজারেটেড উভয় ধরনের কনটেইনারে প্রযোজ্য হবে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, পশ্চিম এশিয়া ও ওশেনিয়ার প্রধান বাণিজ্য রুটগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নতুন কাঠামো অনুযায়ী, শুকনা কনটেইনারে ২০ ফুটে ১৬০ এবং ৪০ ফুটে ৩২০ ডলার সারচার্জ ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে ২০ ফুটে ২১০ ও ৪০ ফুটে ৪২০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। শিপিংসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুটে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এ বাড়তি চার্জ আরোপ করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে এশিয়ার বাণিজ্যে ব্যয় আরও বাড়বে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগজনক। কারণ দেশটি চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও শিল্প উপকরণ আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতেও চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক ভাড়া বৃদ্ধি, দেশীয় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ ট্রানজিট সময়ের কারণে প্রতিযোগিতাসক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে সাপ্লাই-চেইন ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে উঠছে। শিল্পোদ্যোক্তা ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘জ্বালানির বৈশ্বিক দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়েই শিপিং ভাড়া বাড়ছে। এতে সরাসরি ব্যবসার খরচ বাড়ছে। দেশীয় জ্বালানির দাম বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।’ বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘অধিকাংশ পোশাক রপ্তানি ফ্রেইট অন বোর্ড ভিত্তিতে হওয়ায় ক্রেতারা ভাড়া বহন করেন। তবে সিঅ্যান্ডএফ চুক্তির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপানো হবে।’ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতির কারণে বিশেষ করে হরমুজ এলাকায় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এ রুট দিয়ে হওয়ায় এর প্রভাব বৈশ্বিক বাজারে পড়ছে। ফলে অনেক জাহাজ এখন দক্ষিণ আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলে অবস্থিত কেপ অব গুড হোপ হয়ে বিকল্প পথে চলাচল করছে, যার কারণে ডেলিভারি সময় ১৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, চীন-বাংলাদেশ রুটে ইতোমধ্যে প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ ডলার খরচ যোগ হয়েছে।

আগে যেখানে ১৪৫০ থেকে ১৫০০ ডলার খরচ হতো, এখন তা আরও বেড়েছে। এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক নাইজেরিয়ার অর্থনীতিবিদ ড. এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।’ অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এবং ২০২৬ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং শিপিং রুটের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে; যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।