Image description

বাংলাদেশের মোট অভিবাসীর সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশই যায় সৌদি আরবে। সে হিসেবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অর্ধেকের বেশি যায় শুধু এই দেশটিতে। শ্রমবাজারের দ্বিতীয় স্থানে কাতার, চতুর্থ কুয়েত, ষষ্ঠ আরব আমিরাত এবং সপ্তম স্থানে জর্ডান। চলতি মাসের শুরুতে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের শুরু হওয়া যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ড্রোন হামলা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে শ্রমবাজার। মধ্যপ্রাচ্যে ও মধ্যপ্রাচ্যকে ট্রানজিট করে যাওয়া সব শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানো এক মাস ধরে প্রায় শূন্যের কোঠায়। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তা কল্পনাতীত বলে মনে করছেন অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধের দিকে। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় বিকল্প শ্রমবাজারের কর্মীরা।

জানা যায়, গতকাল ২৮ মার্চ পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মোট ৭৯৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ১ মার্চ সর্বোচ্চ ৪০টি এবং ২ মার্চ ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়। এ ছাড়া মাসজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে ৭৯৭টিতে পৌঁছেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। ওমান, জেদ্দাসহ মাত্র কয়েকটি বিমানবন্দর খোলা থাকলেও এভাবে সাধারণ অভিবাসী কর্মীদের জন্য তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর ফলে ঢাকার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

বিএমইটি বলছে, প্রায় ৮০০ ফ্লাইট বাতিলের কারণে যেতে পারেননি কমপক্ষে ৬৫ হাজার অভিবাসী কর্মী। কারণ ফ্লাইট বন্ধের ঠিক আগের মাসেও বিভিন্ন দেশে গেছেন ৬৫ হাজার ৬১৩ জন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে আগের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ১ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ৭৩টি দেশের জন্য মাত্র ৩৬ হাজার ৬৭৩ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবের জন্যই নিয়েছেন ১৯ হাজার ৮২৯ জন, কাতার ৩ হাজার ৯২১, কুয়েত ১ হাজার ৩৫৩ জন, জর্ডান ৮৯১ জন, আমিরাতে ৮৮৪ জন, ইরাকে ৫৯১ জন। বাকি দেশগুলোর জন্য নিয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। কিন্তু ফ্লাইট বিড়ম্বনায় এই সাড়ে ৩৬ হাজারের কেউই দেশ ছাড়তে পারেননি।

নতুনদের বাইরে দেশে এসে আটকে পড়ার সংখ্যাও অনেক। তাঁরা ফ্লাইট বন্ধে দিশাহারা। তাঁদের অনেকের রয়েছে ভিসা জটিলতাও। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের আহাদ ইসলাম বলেন, ‘মাত্র ১০ দিনের ছুটিতে কুয়েত থেকে দেশে এসে আটকা পড়েছি। ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে এসেছিল। পরে কুয়েত সরকার থেকে ভিসার ব্যাপারে শিথিলতার আশ্বাস নিয়েছেন নিয়োগকর্তা। তারপরও অনিশ্চয়তা কাটছে না। আদৌ যেতে পারব কি না, তা নিয়েই রয়েছে সংশয়।’ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে অনেকে নতুন করে সেখানে যেতে ভয় পাচ্ছেন। দেশে ফেরত আসারা পড়েছেন ভিসার মেয়াদ সংকটে। পরিস্থিতি এতটাই নেতিবাচক যে আমাদের আত্মবিশ্বাসও তলানিতে ঠেকেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের কাছে ডিমান্ড নোট পাঠালেও আমরা কর্মী পাঠানোর অনিশ্চয়তার কারণে তা নিতে পারছি না।’ আরেক জনশক্তি রপ্তানিকারক মোবারক উল্ল্যাহ শিমুল বলেন, যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে মহা অনিশ্চয়তা। নতুন ভিসা ইস্যু হচ্ছে না। সৌদি আরবনির্ভরতা কমিয়ে এনে বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করা গেলে এত খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ত না বাংলাদেশের শ্রমবাজার। ইউরোপ ও জাপানের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারও নানা কারণে চালু করা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও প্রভাব ফেলে রাশিয়ার শ্রমবাজারে। রাশিয়া শ্রমবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, রাশিয়া বাংলাদেশের সম্ভাবনার শ্রমবাজার হলেও গুটি কয়েক বাংলাদেশির রাশিয়ায় যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া ও কতিপয় অসাধু রপ্তানিকারকের এ ধরনের মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকা রাশিয়ার বাজারেও ক্ষতি করেছে। অথচ যুদ্ধ বন্ধ হলে সত্যিকার রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে রাশিয়াতেও বাংলাদেশের বড় বিকল্প বাজারের হাতছানি রয়েছে। তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধেরও অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার।