ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতি নিয়ে বিদায়ী বক্তব্যে তার দায়িত্ব পালনের সময়ের বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরেছেন।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দেওয়া এক লিখিত বার্তায় তিনি জানান, উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতির জন্য তার আবেদন সরকার অনুমোদন করেছে এবং তিনি আবার নিজ বিভাগ উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপনায় ফিরে যাচ্ছেন।
বিদায়ী উপাচার্য বলেন, আমি মনে করেছি, আমার দায়িত্ব এখন শেষ হয়েছে। একটি আপৎকালীন সময়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে ছাত্রদের অনুরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলাম।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল, প্রশাসনিক কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে প্রথম লক্ষ্য ছিল একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীলতায় ফেরানো। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উদয়াস্ত কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে। এখন আর সেই আপৎকালীন নাজুক পরিস্থিতি নেই।
ড. নিয়াজ বলেন, উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার কাছে এটি ছিল ‘উদ্ধারকারী মিশন’। আমি কখনোই এটিকে ‘চাকরি’ মনে করিনি। আমার নিয়োগপত্রেও ‘সাময়িক’ নিয়োগের কথাটি লেখা ছিল। চেষ্টা করেছি, সবাইকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল অবস্থা থেকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার।
উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর কয়েকটি বিনীতভাবে আপনাদের জানাচ্ছি:
র্যাংকিং ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি : টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গতবারের তুলনায় ২০০ ধাপ এগিয়ে ৮০০-১০০০ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া, কিউএস বিষয়ভিত্তিক টেকসই র্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ করে বিশ্বসেরা টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬৩৪তম স্থান লাভ করেছে।
ডাকসু নির্বাচন : ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে।
জন ও ছাত্রকল্যাণমূলক কর্মসূচি : আবাসিক হলে গণরুম প্রথা বিলুপ্তিকরণ। আবাসিক হলগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত গণরুম প্রথার কারণে শিক্ষার্থীদের মানবেতর পরিস্থিতিতে বসবাস করতে হতো, মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী এবং প্রভাবশালী ছাত্রনেতা-নেত্রীদের অবৈধ সিট দখলের ফলে অনেক সময় একটি কক্ষেই ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য করা হতো। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘদিনের গণরুম প্রথা বাতিল করে মেধা ও প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে আসন বণ্টনের নীতিমালা চালু করি, যা অতীতে কোনো সময় হয়নি। ফলে হলগুলোর আবাসন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, ন্যায়সঙ্গতা ও স্বচ্ছতা প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রথম বর্ষের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা আবাসনের সুযোগ পাচ্ছে।
এ ছাড়া, হলগুলোয় সুপেয় পানির ব্যবস্থা, খাবারের মানোন্নয়ন, সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিয়মিত বাজেটের বাইরে ব্যয় : আবাসিক হলগুলো প্রায় ৫.৫ কোটি টাকার আসবাবপত্র ও প্রায় ১.৫ কোটি টাকার ফ্যান সরবরাহ করা হয়েছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সংস্কার কাজের জন্য প্রায় ৫.২৫ কোটি টাকা, ভূমিকম্প-পরবর্তী বিভিন্ন হলের সংস্কার কাজে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
ট্রান্সক্রিপ্ট, মার্কশিট ও সার্টিফিকেট সেবায় শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ: শিক্ষার্থীদের ট্রান্সক্রিপ্ট, মার্কশিট ও সার্টিফিকেট সংক্রান্ত সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ট্রান্সক্রিপ্টের অনলাইন আবেদন পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে এবং আবেদন ও উত্তোলনের ধাপসমূহ ওয়েবসাইটে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
অনলাইনে ভর্তি ফি দেওয়া : ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথমবর্ষ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে বা নিজ নিজ অফিসে জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ফি জমা দেওয়ার ভোগান্তি দূর হয়েছে এবং ভর্তি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব হয়েছে।
ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহন সার্ভিস চালুকরণ : শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ চলাচল সহজ ও সুবিধাজনক করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো তিনটি নির্ধারিত রুটে ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহন সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
অনলাইনে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট তালিকাভুক্তিকরণ : রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট তালিকাভুক্তি ম্যানুয়েল পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ অনলাইনে রূপান্তর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড ও ফি পরিশোধ সম্পন্ন হবে।
মেডিক্যাল সেন্টারের আধুনিকায়নে পদক্ষেপ : শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন ও জরুরি চিকিৎসাসেবা জোরদারে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক অ্যাম্বুল্যান্স, এক্স-রে ও ইসিজি যন্ত্রপাতি সংযোজনের পাশাপাশি ইমার্জেন্সি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কার : তুরস্কের সর্ববৃহৎ বেসরকারি সাহায্য সংস্থা আইডিডিইএফ’র অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক এই মসজিদ কমপ্লেক্সে ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগসহ সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়ও মসজিদ পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত আছে। প্রায় ৪০ বছর পর বেসরকারি উদ্যোক্তা সহায়তায় মসজিদের ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নানা উদ্যোগ
সর্বোচ্চ পূজামণ্ডপ : অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ বছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একযোগে সর্বাধিক ৭৬টি পূজামণ্ডপে সরস্বতী পূজা উদযাপন করা হয়, যা গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে অন্তর্ভুক্তির বিবেচনাধীন রয়েছে।
আনন্দ শোভাযাত্রা : সব শ্রেণি ও নৃ-গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৃহত্তম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের করা হয়।
ঈদ শোভাযাত্রা : ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গতবছর সবাইকে নিয়ে সর্বজনীন ‘ঈদ শোভাযাত্রা’ বের করা হয়।
‘সাত কলেজ’ পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান : সরকার ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘সাত কলেজ’ বিষয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান করা হয়। ‘সাত কলেজের’ সব প্রশাসনিক, একাডেমিক ও আর্থিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আমার অনেক সীমাবদ্ধতা এবং ব্যর্থতা সত্ত্বেও আপনাদের সবার সমর্থনে এবং সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের প্রত্যক্ষ অবদানে ভালো যা কিছু করার তৌফিক আল্লাহ আমাকে দিলেন— তার জন্য আপনাদের সবার প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা। এই দীর্ঘ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।
আমি দেশে এবং শিক্ষা সেবাতেই থাকছি, ইনশাআল্লাহ। দেশের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে যদি কোনো কাজে লাগতে পারি, তার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছি। আপনাদের প্রত্যেকের জন্য দোয়া ও শুভ কামনা। ভালো থাকুন।