Image description

ইরান যুদ্ধের আঁচ লেগেছে লেবাননেও। ইসরায়েল দেশটিতে ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে। এমন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শত শত বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মী সেখানে কাজ ও বাসস্থান হারিয়েছেন।

দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অনেক বাংলাদেশী এখন বৃষ্টি আর ঠাণ্ডার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকেই নারী। কেউ কেউ যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তা বোমা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাকি পড়েছে বেতন, হাতে নেই কাজ। তার ওপর আছে মিসাইল কিংবা বিমান হামলার ভয়।

দক্ষিণাঞ্চলের সিয়াহ এলাকার আল আসাদ নামক স্থানে আশ্রয় নেয়া এমন ২৫ জন বাংলাদেশীর একটি দলের সঙ্গে সম্প্রতি যোগাযোগ হয়েছে বণিক বার্তার। যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী এবং কয়েকজন পুরুষ। যুদ্ধের তীব্রতায় ঘরবাড়ি ছেড়ে তারা এখন খোলা আকাশের নিচে একটি মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এভাবে দিন কাটছে তাদের। শুধু এ ২৫ বাংলাদেশীই নন, এ রকম শত শত প্রবাসী বাংলাদেশী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চরম দুর্দশা আর ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা। আচমকা যুদ্ধের তীব্রতায় তারা হারিয়েছেন চাকরি এবং বাসস্থান। বিমান হামলা থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন খোলা মাঠ। আবার কেউ কেউ থাকছেন রাস্তায়, গাছের নিচে। অনেকে চলে গেছেন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ লেবাননের উত্তরাঞ্চলে।

 

আল আসাদ নামক স্থানে আশ্রয় নেয়া যে ২৫ প্রবাসীর সঙ্গে বণিক বার্তার যোগাযোগ হয়েছে তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে কাজ করছেন। এদের মধ্যে আছেন কিশোরগঞ্জের বেদেনা আক্তার, স্বর্ণা আক্তার, শিল্পী, রুবি, মরিয়াম, মরিয়ামের স্বামী হাবিবুর রহমান, আনোয়ারা ও তার বোন মনোয়ারা এবং মদিনা। এছাড়া মানিকগঞ্জের নূরজাহান, পাবনার সামিয়া আক্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলেয়া, ফরিদপুরের মালা, মুন্সিগঞ্জের রুমা, দিনাজপুরের জাকিয়া এবং কুমিল্লার ওয়াসিম, কিশোরগঞ্জের মোবারক, শামীম ও আশিক। আরো রয়েছেন ময়মনসিংহের নাছিমা আক্তার, রূপা ও নজরুল ইসলাম।

 

সিয়াহ এলাকায় ১৬ বছর ধরে বসবাস করছেন প্রবাসী রুমা আক্তার। তিনি সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘এখন আমরা মাঠে থাকি, বাড়িঘরে ঢুকন যায় না, কোনো নিরাপত্তা নাই। কাজকর্ম সবার বন্ধ, একটা মানুষেরও কাজ নাই। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নাই, এ পর্যন্ত এত যুদ্ধ হইতেছে কেউ খবরও লয় না, কেউ কোনো খাবার দেয় না। একজনের খাওন ১০ জনে খায়, এক বেলা খাইলে দুই বেলা না খাইয়া থাকা লাগে। এ দেশে বৃষ্টি-ঠাণ্ডা। একটা খালি মাঠ আছে, সেই মাঠের ভিতর সবাই মিল্লা বইয়া থাকি। যুদ্ধ শুরু হইলে দৌড়াই, আবার পরিস্থিতি বুঝলে ফিরে আসি। এমনে রাস্তার ভিতরে আপ-ডাউন করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘তারা কইতাছে যুদ্ধ হইলে আপনারা আরেক এলাকায় যান। মানুষের কাছে টাকা পয়সা না থাকলে, কোনো সাহায্য না থাকলে কোন এলাকায় যাইব? ২০২৪ সালের যুদ্ধে আমার হাত ভাইঙ্গা লাইছি। কোনো সাহায্য পাই নাই। নিজে দেনা কইরা এই দেশে অপারেশন করছি।’

বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের দাহিয়ে এলাকায় কাজ করতেন কিশোরগঞ্জের বেদেনা আক্তার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কর্মস্থল ছেড়ে বর্তমানে সিয়াহ এলাকায় এসেছি। এখানে আমরা প্রায় ২৫ জন প্রবাসী আছি। এর মধ্যে কয়েকজন পুরুষও আছে। দিনের বেলায় আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করে রাতে সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়ে খোলা মাঠে বসে থাকি। রোববার (১৫ মার্চ) রাতে যেমন ছিল বোমাবর্ষণ, তেমন ছিল বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা। খুব কষ্ট হচ্ছে এখানে। কিন্তু কোথাও যেতেও পারছি না।’

অর্থের অভাবে খোলা মাঠে দিন পার করছেন বলে জানান মানিকগঞ্জের নূরজাহান। তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো লোকজন নেই। দোকানও বন্ধ। আমরা তিন-চারদিন পর একদিন গোসল করি। খাওয়া-দাওয়াও ঠিক নেই। কষ্ট করে একজনের খাবার কয়েকজনে মিলে খাচ্ছি।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত এ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে কেন যাচ্ছেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকা নিরাপদ আছে সেখানে গিয়ে থাকার মতো অবস্থা নেই। কাজ করতে পারছি না। আয়-রোজগারও নেই। এ অবস্থায় সেসব এলাকায় গিয়ে একটা রুম নিয়ে তার ভাড়া দেয়া সম্ভব না। তাই এখানে খোলা মাঠে সবাই মিলে দিন কাটাচ্ছি।’

যুদ্ধের শুরুর দিকে বৈরুতের দাহিয়ে এলাকায় হঠাৎ বোমা হামলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যে রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন তার সামনে বিস্ফোরণের পরপরই প্রাণ বাঁচাতে কাজ ফেলে স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে নিয়ে গভীর রাতে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এখলাসুর রহমান। তিনি জানান, তার ছিল নাইট ডিউটি। কাজের জায়গা থেকে ছুটে গিয়ে শিশুসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে মাঝরাতে বের হয়ে যান। দাহিয়ে এলাকা থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে আশ্রয় নেন।

এখলাসুর বণিক বার্তাকে জানান, যে মালিকদের কাছে কাজ করতেন, যুদ্ধের কারণে তাদের ভবন রকেট হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বেতন পাননি। তার প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার পাওনা আটকে আছে। সেই টাকা পেলে অন্তত কয়েক মাস চলতে পারতেন। কিন্তু এখন নিজের, স্ত্রী ও শিশুর প্রয়োজনীয় কাপড় পর্যন্ত সঙ্গে নেই। সামনে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।

মাজদা গাড়ি কোম্পানিতে ক্লিনার হিসেবে কাজ করেন প্রবাসী বারেক হাসান। তিনি জানিয়েছেন বর্তমানে একটি গাছের নিচে কাটছে তার দিনরাত। তার স্ত্রী আরেক জায়গায় কয়েকজন বাংলাদেশী নারী কর্মীর সঙ্গে থাকছেন। বণিক বার্তাকে নিজের পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বারেক বলেন, ‘১৫ দিন ধরে আমি ঘরে ঘুমাইতে পারি না। সিয়াহ এলাকার বাসা থেকে আমাদের বাইর করে দিছে। এখন রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে থাকি। প্রচুর বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা, দুইদিন ধরে মসজিদের ভিতর ঘুমাই। আমার বউ অন্য জায়গায় কয়েকজন বাঙালি মহিলার সঙ্গে থাকে। আমাদের যাওয়ার জায়গা নাই, ঘর ভাড়া অনেক। মিসাইল এক কিলোমিটার দূরে পড়লেও সব কাঁপে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দা অ্যাফেয়ার্স এআই ও প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গত যুদ্ধের পর থেকেই বাংলাদেশীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রবাসীরা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে আমাদের বেশির ভাগ কর্মী কৃষি খামার এবং বাড়িতে কাজ করেন। আক্রমণগুলো মূলত কয়েকটি শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় যারা প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতেন তারা এখনো অনেকটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, আমরা তাদের বৈরুতের দিকে নিরাপদ স্থানে চলে আসতে বলছি এবং গাড়ির ব্যবস্থাও করছি। তবে অনেকে আসতে রাজি হচ্ছেন না, তারা পরিচিত পরিবেশে থেকেই পরিস্থিতি দেখতে চাইছেন।’

বাস্তুচ্যুত হওয়ায় প্রবাসীদের খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লেবাননের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জায়গায় শেল্টারের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু আমাদের লোকজন সেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে তারা পরিচিত বাংলাদেশী কমিউনিটির কাছাকাছি থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। যখনই আমরা কোথাও খাবার বা অন্য সমস্যার তথ্য পাচ্ছি, মোবাইল টিম পাঠিয়ে খুঁজে খুঁজে তাদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করছি। স্থানীয় এনজিও এবং লোকাল অথরিটির সঙ্গেও সমন্বয় রাখছি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাস্তাঘাটে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।’”