পৃথিবীতে ‘আরব বিশ্ব’ বলতে একটি স্পষ্ট ও উল্লেখযোগ্য ব্লক আছে। কিন্তু এই অঘোষিত জোট বা পক্ষের সামষ্টিক কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা কৌশলগত নীতি নেই। যেমনটা আছে পশ্চিমাদের ব্লকের, যার নাম ন্যাটো। এই সামরিক জোট যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা।
অপরদিকে বর্তমান নৈরাজ্যবাদী বিশ্বে মধ্যপ্রাচ্যের মতো সহিংসতা ও সংঘাতময় অঞ্চলে টিকে থাকার একমাত্র নির্ভরতা নিজস্ব সক্ষমতা। সেই ভাবনা ও দূরদর্শিতা থেকে ইরান তার নিজ যোগ্যতায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সুরক্ষিত করেছে, গড়ে তুলেছে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার।
এই কর্মসূচি তাদের টিকে থাকার হাতিয়ার হলেও এখানে নজর পড়েছে ইসরাইল ও পশ্চিমাদের। তারা এ কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার জন্য ইরানকে বাধ্য করতে একের পর এক হুমকি দিয়ে আসছে, আবার কূটনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য দফায় দফায় বসছে আলোচনায়।
যেখানে রাষ্ট্রগুলোকে তাদের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে ইরান কোনোভাবেই তার প্রতিরক্ষা মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে পারে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং এ বিষয়ে তেহরানের ‘অ-আলোচনাযোগ্য’ অবস্থানের জেদ দেশটির সঙ্গে পশ্চিমাবিশ্বের মতপার্থক্যের অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ থেকে শুরু করে তিনটি ইউরোপীয় দেশও (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি) সমন্বিত অবস্থান পর্যন্ত বিস্তৃত।
মূল প্রশ্ন হলো: ‘কেন ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় বসতে এত দৃঢ়ভাবে নারাজ?’ এর উত্তর অবশ্যই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি, ইরানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং একটি অস্থির পরিবেশে টিকে থাকার যুক্তির মধ্যে খুঁজতে হবে।
সমর্থনহীন বিশ্ব ও স্বনির্ভর ব্যবস্থা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বব্যবস্থা হলো ‘নৈরাজ্যবাদী’; অর্থাৎ এমন কোনো নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ নেই, যা কোনো দেশ আক্রান্ত হলে তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারে। জাতিসংঘ ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও অনেক সংকটে দেখিয়েছে যে, তাদের সিদ্ধান্তগুলো ভেটো ক্ষমতার অধিকারী শক্তিগুলোর ইচ্ছাধীন।
এমন পরিবেশে সব দেশকে তার নিজের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নিজেই দায়ী থাকতে হয়।
এই যুক্তি অনুযায়ী, শুধু অন্যদের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করা ব্যয়বহুল এবং এমনকি আত্মঘাতী হতে পারে। যেসব দেশ পরাশক্তিদের রাজনৈতিক গ্যারান্টির ওপর ভরসা করেছিল, তারা ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে একা হয়ে পড়েছে এবং বিষয়টি অনেক সরকারের জন্য শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যেখানে হুমকিগুলো বাস্তব ও চিরস্থায়ী, সেখানে সামরিক সক্ষমতা কমানোকে শান্তির চিহ্ন হিসেবে নয়, বরং এক ধরণের কৌশলগত বোকামি হিসেবে দেখা হয়।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও ক্ষেপণাস্ত্র মতবাদের গঠন
মিসাইল সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়ে ইরানের অনমনীয়তার শিকড় একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় প্রোথিত: ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ। সেই সময়ে ইরান চরম অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছিল, অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামল ব্যাপক অস্ত্র সহায়তা উপভোগ করেছিল। শহরগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি, রাসায়নিক হামলা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ইরানের জন্য একটি তিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী অভিজ্ঞতা রেখে গেছে।
সেই বছরগুলোতে ইরানের কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না। এই প্রতিরক্ষা শূন্যতা দেশটির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। নীতিনির্ধারকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। যেহেতু উন্নত যুদ্ধবিমান কিনে বিমান বাহিনীর ব্যাপক আধুনিকায়ন করা নিষেধাজ্ঞা এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে কার্যত অসম্ভব ছিল, তাই দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার উন্নয়নকে একটি বাস্তবসম্মত, সহজলভ্য এবং কম ব্যয়বহুল বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
কৌশলগত দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের বেশ কিছু সুবিধা ছিল: বিদেশের ওপর নির্ভরতা কম, আধুনিক বিমান বাহিনীর তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম এবং একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা। এভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ছিল একটি গুরুতর নিরাপত্তা শূন্যতার প্রতিক্রিয়া। ১৯৬০-এর দশকের সেই অরক্ষিত অবস্থায় ফিরে যাওয়া ইরানের জন্য কোনো বিকল্প নয়।
একটি অসম পরিবেশে প্রতিরোধ
ইরান বিশ্বের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটির চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি, পারস্য উপসাগরীয় কিছু দেশের বিশাল অস্ত্র ক্রয় এবং ইসরাইলের উন্নত সামরিক সক্ষমতা একটি অসম ভারসাম্য তৈরি করেছে। ইরানের অনেক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী অত্যন্ত উন্নত যুদ্ধবিমান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত।
এমন পরিস্থিতিতে, এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের সঙ্গে সমান্তরাল প্রতিযোগিতা করতে ব্যাপক বাজেটের প্রয়োজন এবং বিশ্ব অস্ত্র বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকার দরকার, যা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ কারণে ইরান ‘অপ্রতিসম প্রতিরোধ’ কৌশল নিয়েছে; অর্থাৎ এমন সরঞ্জামের ব্যবহার যা কম খরচে একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
মিসাইল শক্তি এই প্রেক্ষাপটেই অর্থবহ। এই শক্তি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে হামলার শিকার হলে পাল্টা হামলা চালানো যায়, যা ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই প্রতিরোধ যুক্তিতে লক্ষ্য যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং তা প্রতিরোধ করা। এই পদ্ধতির বার্তা স্পষ্ট: যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে।
তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, যখন প্রতিপক্ষের হুমকি ও অস্ত্রের সুবিধাগুলো অক্ষুণ্ণ থাকে, তখন এই সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করা মানে ভারসাম্যকে ইরানের প্রতিকূলে ঠেলে দেওয়া। গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশে একতরফা নিরস্ত্রীকরণ বা কঠোর সীমাবদ্ধতা বিপজ্জনক অরক্ষিত অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সার্বভৌমত্ব ও দ্বিমুখী নীতির প্রশ্ন
ইরান জোর দিয়ে বলছে যে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাধারণ প্রতিরক্ষা অস্ত্র, গণবিধ্বংসী অস্ত্র নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য সাধারণ অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার অধিকার সব দেশের আছে। যেহেতু পরাশক্তি ও কিছু আঞ্চলিক দেশের কাছে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র এমনকি পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আছে, তাই ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করার আহ্বানকে একটি দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখে।
বৈষম্যের এই অনুভূতি জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। ইরান নিজেকে একটি স্বাধীন দেশ মনে করে, যার নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আরোপিত সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া মানে দেশের মর্যাদা ক্ষুন্ন করা ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরণের কাঠামোগত বৈষম্য মেনে নেওয়া।
অন্য কথায়, বিষয়টি কেবল প্রযুক্তিগত বা সামরিক নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। তাই ইরানের অফিসিয়াল বা দাপ্তরিক বক্তব্যে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে কেবল একটি সামরিক সরঞ্জাম নয়, বরং স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরমাণু চুক্তির অভিজ্ঞতা ও পিচ্ছিল ঢাল নিয়ে উদ্বেগ
ক্ষেপণাস্ত্র আলোচনার বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তিগুলোর একটি হলো পরমাণু চুক্তির অভিজ্ঞতা। জেসিপিও নামে সেই চুক্তিতে ইরান ব্যাপক সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছিল, কিন্তু চুক্তি থেকে আমেরিকার প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের কারণে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা অনেক ইরানি নীতিনির্ধারককে বার্তা দিয়েছে যে, বড় ধরণের ছাড় দিলেও প্রতিপক্ষের অঙ্গীকারের গ্যারান্টি পাওয়া যায় না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ‘পিচ্ছিল ঢাল’ বা ক্রমবর্ধমান দাবির উদ্বেগ আছে: ইরান যদি আজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বা সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করে, তবে কাল নতুন নতুন দাবি তোলা হবে—যেমন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও কমানো, আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা বা রাজনৈতিক আচরণ পরিবর্তন করা। সুতরাং, একটি স্পষ্ট 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করাকে চাপের মুখে বাঁধ হিসেবে দেখা হয়।
এমন কাঠামোতে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আলোচনাকে একটি সীমিত আলাপ হিসেবে নয়, বরং এমন একটি প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে দেখা হয় যা পর্যায়ক্রমে দেশটির প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
কূটনীতি ও অর্থনীতির সমর্থন হিসেবে সামরিক শক্তি
বাস্তবসম্মতভাবে, হার্ড পাওয়ার বা সামরিক শক্তির সমর্থন ছাড়া কূটনীতি খুব একটা কার্যকর নয়। আলোচনা তখনই কার্যকর হয় যখন অন্য পক্ষ জানে যে আপনার কাছে চাপ দেওয়ার এবং জবাব দেওয়ার যথেষ্ট সরঞ্জাম আছে। ইরানের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দেশটির দর কষাকষির অবস্থানকে শক্তিশালী করে এবং আলোচনাকে কেবল দুর্বল অবস্থান থেকে পরিচালনা করতে বাধা দেয়।
তাছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা একটি পূর্বশর্ত। একটি উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে যদি শোধনাগার, বন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সরাসরি হুমকির মুখে থাকে, তবে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল হামলার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়, পাশাপাশি আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা দেয়। তাই এই পদ্ধতির সমর্থকদের দৃষ্টিতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় হলো একটি দেশের অস্তিত্ব ও অর্থনীতির জন্য এক ধরণের বিমা।
উপসংহার
একটি ভঙ্গুর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় টিকে থাকার যুক্তির আলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার অ-আলোচনাযোগ্য প্রকৃতির বিশ্লেষণ করতে হবে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘায়িত নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি গ্যারান্টির ওপর অবিশ্বাস এবং অসম আঞ্চলিক ভারসাম্য—সবই এই দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা পালন করেছে।
এই অর্থে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কেবল একটি সামরিক সরঞ্জাম নয়; এটি প্রতিরোধের মেরুদণ্ড এবং দেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দুঃসাহসিক আগ্রাসন প্রতিরোধের গ্যারান্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সক্ষমতা হ্রাস করা বা সীমাবদ্ধ করা কোনো আলোচনার বিষয় নয়, বরং তা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করার শামিল।