ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশটির ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে গভীর চাপে ফেললেও আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া এবার আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। ২০২২ সালে ইরানে ব্যাপক আন্দোলনের সময় সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত প্যান-আরব সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে বিক্ষোভের খবর প্রচার করেছিল, এবার তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সে সময় সৌদি-সমর্থিত গণমাধ্যমগুলোর জোরালো প্রচারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তৎকালীন প্রধান হোসেইন সালামি। তিনি সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ইরানের অস্থিরতা উসকে দেওয়া বন্ধ না করলে তার মূল্য দিতে হবে। তবে সেই সালামি এখন আর জীবিত নেই, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব বিশ্বের অবস্থান বদলের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে—ইরানের আঞ্চলিক শক্তি কমে যাওয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা-ভীতি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলাগুলো ইরানের আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক কার্যত ভেঙে দিয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের ইরানঘনিষ্ঠ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে এবং ইরান নিজেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা ১২ দিনের বিমান হামলায় বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে আর আগের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে ‘দ্বিতীয় সারির শক্তি’ বলে অভিহিত করেন। তার এ মূল্যায়নের সঙ্গে অনেক আরব কর্মকর্তাও এখন একমত।
ফলে আরব বিশ্বের সংবাদ ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরান এখন আর প্রধান আলোচনার কেন্দ্র নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের টানাপোড়েন এবং উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সংঘর্ষই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে ইরান এখনো পুরোপুরি শক্তিহীন নয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেহরানের হাতে এখনো হাজার হাজার স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানতে পারে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর কাতারের আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যদিও তা ছিল মূলত প্রতীকী।
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আবার হামলা হলে তারা লক্ষ্যবস্তু আরও বাড়াতে পারে—এমনকি বাহরাইন পর্যন্ত। এই হুমকি বাস্তব হোক বা কৌশলগত, উপসাগরীয় শাসকগোষ্ঠীগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো—ইরানে রাষ্ট্রীয় পতন হলে কী হবে। ইরাক ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আরব দেশগুলো জানে, রাষ্ট্রীয় পতনের পর জঙ্গি, অস্ত্র ও মাদক প্রবাহ কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের ইরান উপসাগরের খুব কাছেই অবস্থিত; সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে শরণার্থী ঢল, অস্ত্র পাচার এবং এমনকি পারমাণবিক উপাদান ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণেই ইরানের বর্তমান সরকারের প্রতি বিরাগ থাকা সত্ত্বেও অনেক আরব সরকার এখন প্রকাশ্যে বিক্ষোভের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, তেহরানের অস্থিরতা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের চেয়ে বেশি করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিশৃঙ্খলাই ডেকে আনতে পারে।