Image description

ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে আন্তর্জাতিক আইনের যে ক্ষুণœ হয়েছে, তা স্পষ্ট। এদিকে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত নেতা নিকোলাস মাদুরোর মার্কিন হেফাজত থেকে মুক্তির দাবিতে শুরু হওয়া সংসদীয় অধিবেশনে মঙ্গলবার শপথ নেন তিনি।

অন্যদিকে মার্কিন বিচার বিভাগ এতদিন ধরে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করে আসছিল, ভেনিজুয়েলায় মার্কিন অভিযান ও মাদুরোর আটকের পর সেই অভিযোগ থেকে সরে এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন মতে, মাদুরো কার্টেল দে লস সোলস নামে একটি মাদক পাচার গোষ্ঠী চালান বলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যে দাবি, বাস্তবে এমন সংগঠনের কোনো অস্তিত্বই নেই। গত বছরের জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরই ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে এই দাবিটি প্রচার করে। কার্টেল দে লস সোলস যে একটি বাস্তব সংগঠন ছিল এমন ধারণাই বাতিল করেছেন মার্কিন প্রসিকিউটররা। খবর সিএনএন, বিবিসি ও আলজাজিরার।

এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মুখপাত্র বলেন- জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ওয়াশিংটনের তত্ত্বাবধানে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দায়িত্ব পালন শুরু করায় বহু ভেনিজুয়েলাবাসী আতঙ্কিত। একই সঙ্গে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম তেল কোম্পানিগুলোর সহায়তায় ভেনিজুয়েলার তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি স্পষ্ট যে এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতিকে ক্ষুণœ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা সরকারের দীর্ঘদিনের ভয়াবহ মানবাধিকার রেকর্ডের কথা উল্লেখ করে হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা দেখিয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় না। ভেনিজুয়েলার জনগণ ন্যায়সঙ্গত ও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি পাওয়ার যোগ্য। মঙ্গলবার বিবিসির খবরে বলা হয়, ২০১৮ সাল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৫৬ বছর বয়সী রদ্রিগেজ বলেছেন, শনিবার অভিযান চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের অপহরণ এর ঘটনায় তিনি ব্যথিত।

এর আগে নিউইয়র্কের একটি আদালত কক্ষের ভেতরে এক নাটকীয় দৃশ্যে মাদুরো জোর দিয়ে বলেন, তিনি এখনো ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট আছেন। কারণ তিনি মাদক পাচার এবং সন্ত্রাসবাদের চারটি অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। এদিকে রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর মার্কিন ম্যাগাজিন দ্য আটলান্টিককে দেওয়া মন্তব্যে ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, তিনি যদি যা সঠিক তা না করেন তবে তাকে খুব বড় মূল্য দিতে হবে। সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি। তবে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে রদ্রিগেজ ইঙ্গিত দেন যে, তার সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে।

তিনি বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে ভাগ করে নেওয়া উন্নয়ন ভিত্তিক সহযোগিতার একটি এজেন্ডায় আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য মার্কিন সরকারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণের সময় ভেনিজুয়েলার হাজার হাজার মানুষ ফেডারেল আইনসভার বাইরে জড়ো হয়েছিলেন। শপথ গ্রহণের পর বক্তব্য রাখতে গিয়ে রদ্রিগেজ জাতীয় পরিষদে বলেন যে অবৈধ সামরিক আগ্রাসনের কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগের কারণে তিনি বেদনা নিয়ে এই শপথ গ্রহণ করেছেন। এ সময় রদ্রিগেজ দেশের শান্তি, জনগণের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশান্তি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে এমনটাই জানিয়েছেন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে আমরা পুনরায় দূতাবাস খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

তবে পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। কারাকাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দূতাবাস পুনরায় চালু করতে যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমরা এটি নিয়ে ভাবছি। ২০১৯ সালে ভেনিজুয়েলায় দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্রাম্প, বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতা জুয়ান গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এবং নিকোলাস মাদুরোর ২০১৮ সালের পুনর্নির্বাচনকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করার পর এই পদক্ষেপ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তারপর থেকে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন দায়িত্ব প্রতিবেশী কলম্বিয়ার দূতাবাস থেকে পরিচালিত হয়। এর আগে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান ও নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে তাকে নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত করার পর এই ঘটনা ঘটল।

এদিকে ভেনিজুয়েলার বিরোধী দলীয় নেত্রী শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো বলেছেন, ভেনিজুয়েলা মার্কিন জ্বালানির প্রাণকেন্দ্র হবে। ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ফক্স নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। মাচাদো বহু আগে থেকেই ভেনিজুয়েলার মাদুরো সরকারকে উৎখাতের কথা বলে আসছেন। এমনকি এজন্য তিনি প্রকাশ্যেই মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানান। গত বছর তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এর ফলে নরওয়ের সঙ্গে মাদুরো সরকারের কূটনৈতিক টানাপড়েন দেখা দেয়।

এদিকে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মিরাফ্লোরেসের কাছে প্রচ- গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণ ও ড্রোন ওড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক মাসের অব্যাহত সামরিক চাপ ও হুমকির পর গত শনিবার লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। মাদক পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। 
এরপর থেকেই ভেনিজুয়েলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। এএফপির প্রতিবেদন মতে, মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মিরাফ্লোরেসের কাছে প্রচ- গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা পরই প্রাসাদের ওপর দিয়ে কিছু ড্রোন উড়তে দেখা যায়। সেই ড্রোনগুলোকে লক্ষ্য করেই প্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীরা গুলি ছোড়ে। প্রতিবেদন অনুসারে, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ড্রোনের উপস্থিতি এবং রাতের আঁধারে গোলাগুলির এই ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গোলাগুলির এই শব্দ শনিবারের মার্কিন হামলার মতো অতটা ভয়াবহ না হলেও এতে পুরো কারাকাসের মধ্যাঞ্চলে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রাসাদ থেকে মাত্র পাঁচ ব্লক দূরে বসবাসকারী এক বাসিন্দা জানান, প্রায় এক মিনিট ধরে টানা গোলাগুলি চলে। তিনি আরও জানান, গুলির শব্দ শুনে তিনি আকাশের দিকে তাকালে কোনো বিমান দেখতে পাননি। তবে দুটি রহস্যময় লাল আলো জ্বলতে দেখতে পান। সে সময় কী ঘটছে তা বুঝতে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করেন।