ইরানে সাধারণ মানুষের জীবনধারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভের আগুন। এখন সেই বিক্ষোভ চলছে টানা ছয় দিন ধরে।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দেশবাসীর প্রতি ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য বাইরের ‘শত্রুদের’ দায় রয়েছে। যদিও সরকার অর্থনীতি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলছে, তবু রাস্তায় সাধারণ মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে।
গত সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা প্রথমে দোকান বন্ধ করে প্রতিবাদ শুরু করেন। তারপর থেকেই ৩১টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ১৭টিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন।
বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন এবং ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লরদেগান শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজন প্রাণ হারান। আরও তিনজন মারা যান আজনা ও কুহদাশতের বিক্ষোভে।
এত বড় আকারের আন্দোলন অনেকের কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগেও ২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিশাল আন্দোলন হয়েছিল। সে সময় ব্যাপক ধরপাকড়, টিয়ারগ্যাস, গুলি এবং শত শত মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘ পরে সে সময়কার দমননীতিকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে উল্লেখ করে।
এই বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক সংকটই মূল কারণ। রিয়ালের মান মাত্র ছয় মাসে ৫৬ শতাংশ কমে গিয়ে ১ ডলার ১৪ লাখ ২০ হাজার রিয়ালে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের দাম আগের বছরের তুলনায় গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়েছে।
তেহরানের ট্যাক্সিচালক মাজিদ এবরাহিমি বলেন, ‘সরকার শুধু জ্বালানি নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু বাকি জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। দুগ্ধজাত পণ্যের দাম ছয়গুণ বেড়েছে, আর অন্যান্য জিনিসপত্র ১০ গুণ।’
বিক্ষোভ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এখন তা রাজনৈতিক রূপও নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যুক্ত হচ্ছেন, প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। লরদেগানে প্রদেশের প্রশাসনিক কার্যালয়, মসজিদ, শহরের হল এবং ব্যাংকে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সেখানে টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করেছে।
তবে সরকার এখনো আগের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং কিছু কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বুধবার নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আবদোনাসের হেমমাতি। তিনি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর অঙ্গীকার করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পাস নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে—‘অসদাচরণ ও আন্দোলন সামলাতে ব্যর্থতা’।
বৃহস্পতিবার কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা দুর্নীতি, ঘুষ ও চোরাচালান বন্ধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যারা এসব সুবিধা ভোগ করে, তারা বাধা দেবে—তবু আমরা থামব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের অধিকার রক্ষা ও দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। মানুষের জীবিকা রক্ষা আমাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।’
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে।’
ইসরায়েলও তাদের ফারসি ভাষার এক পোস্টে ইরানিদের ‘অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর যুদ্ধে’ এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
এর মধ্যে আবার চলতি বছর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের এক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে নতুন করে আক্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
সবশেষে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর কোনো অন্যায় আগ্রাসনের জবাব হবে কঠোর।’