কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যতই উন্নত হোক, শক্তি সাশ্রয় এবং অপরিচিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্ক এখনো এক বিস্ময়কর উদাহরণ। মস্তিষ্কের এই অসাধারণ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটিং প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। সেই প্রচেষ্টায় এবার যুক্ত হয়েছে এক অভিনব রোবট কুকুর, যার চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়েছে গবেষণাগারে তৈরি জীবন্ত নিউরন বা স্নায়ুকোষ।
অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কর্টিক্যাল ল্যাবসের গবেষকেরা জীবন্ত নিউরন দিয়ে তৈরি একটি কম্পিউটিং চিপ ব্যবহার করে রোবট কুকুরটিকে একটি সাধারণ মানচিত্রে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে পরিচালিত করেছেন। জীববিজ্ঞান ও রোবোটিকসের এই সমন্বয় ভবিষ্যতের কম্পিউটিং প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এতে প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক প্রসেসরের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে জীবন্ত স্নায়ুকোষ। গবেষকেরা চিপের ওপরই নিউরনগুলোকে বৃদ্ধি করেছেন। এরপর ইলেকট্রোডের মাধ্যমে নিউরনগুলোর সঙ্গে দ্বিমুখী বৈদ্যুতিক যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ চিপে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে নিউরনগুলোকে উদ্দীপিত করা যায়, আবার নিউরনের কার্যকলাপ থেকেও সংকেত সংগ্রহ করা সম্ভব।
এই সংকেত বিশ্লেষণ করে রোবটের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। নিউরনগুলোর কার্যকলাপ, বৈদ্যুতিক সংকেত এবং রোবটের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি ফিডব্যাক বা প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে জীবন্ত কোষের কার্যকলাপকে বাস্তব জগতের যন্ত্রের গতিবিধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন গবেষকেরা।
কর্টিক্যাল ল্যাবসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ব্রেট কাগানের মতে, রোবট কুকুরের এই পরীক্ষা জীববিজ্ঞানের অগ্রগতি কীভাবে বাস্তব প্রযুক্তিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে, তার একটি সহজ কিন্তু দৃশ্যমান উদাহরণ। তার ভাষায়, দীর্ঘ মেয়াদে এই পদ্ধতি এমন রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে, যেগুলো অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।
গবেষকদের এই উদ্যোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রচলিত রোবোটিকসের সীমাবদ্ধতার দিকে তাকাতে হয়। আধুনিক রোবট হাঁটতে, দৌড়াতে কিংবা জটিল শারীরিক কসরত করতে পারলেও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন পরিস্থিতিতে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কর্টিক্যাল ল্যাবসের গবেষকদের ধারণা, জীবন্ত নিউরনের অভিযোজনক্ষমতা এ ধরনের সমস্যার নতুন সমাধান দিতে পারে।
এটি অবশ্য কর্টিক্যাল ল্যাবসের প্রথম এমন পরীক্ষা নয়। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি নিউরনের সমন্বয়ে গঠিত চিপ দিয়ে কম্পিউটার গেম পং এবং ডুম খেলার সক্ষমতা দেখিয়েছিল। এবার সেই প্রযুক্তিকে ভার্চ্যুয়াল পরিবেশের বাইরে এনে বাস্তব রোবটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
একই ধরনের আরেকটি গবেষণা কর্টিক্যাল ল্যাবস ও হোন্ডা রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইউরোপ যৌথভাবে পরিচালনা করেছে। সেখানে বাস্তব রোবটের পরিবর্তে ভার্চ্যুয়াল পরিবেশে একটি এজেন্টকে গ্রিডভিত্তিক মানচিত্রে চলাচল করিয়ে নির্দিষ্ট পুরস্কার বা লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রেও নিউরনযুক্ত চিপে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো এবং নিউরনের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সংকেতের ধরন পরিবর্তন এবং এজেন্টের প্রতিটি পদক্ষেপের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মাধ্যমে নিউরনগুলোর কার্যকলাপকে নির্দিষ্ট আচরণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন গবেষকেরা।
এই পরীক্ষায় চিপ ও ভার্চ্যুয়াল এজেন্টের মধ্যে চার হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে যোগাযোগ চালানো হয়। এ সময় প্রায় ১ হাজার ৩০০টি ভিন্ন বৈদ্যুতিক সংকেতের সমন্বয় পরীক্ষা করা হয়েছে। এত দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জীবন্ত নিউরনকে কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় এবং তাদের প্রতিক্রিয়াকে কীভাবে নিয়ন্ত্রিত আচরণে রূপান্তর করা সম্ভব, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন গবেষকেরা।
হোন্ডা রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইউরোপের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ট্যানেবার্গের মতে, জীবন্ত কোষকে কম্পিউটিংয়ের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে শক্তি সাশ্রয়, স্থিতিস্থাপকতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার দিক থেকে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা যথেষ্ট আকর্ষণীয়।
তবে এখনই জীবন্ত নিউরন দিয়ে তৈরি চিপকে প্রচলিত কম্পিউটার বা এআই প্রসেসরের বিকল্প ভাবার সুযোগ নেই। প্রযুক্তিটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর গতি, দক্ষতা এবং নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। গবেষকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে আরও বেশি নিউরনকে একসঙ্গে যুক্ত করা যায়, কীভাবে তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় এবং কীভাবে আরও জটিল কাজ সম্পন্ন করানো যায়।
এ ছাড়া নিউরনভিত্তিক চিপ কীভাবে তথ্য ধরে রাখে, তাদের মধ্যে স্মৃতির মতো কোনো ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং সেই তথ্য পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা জানার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
কর্টিক্যাল ল্যাবসের গবেষণা সফটওয়্যার প্রকৌশলী জনসন ঝৌ মনে করেন, চিপের ওপর নিউরন বৃদ্ধি করাই এই প্রযুক্তির মূল চ্যালেঞ্জ নয়। বরং জীবন্ত স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে নির্ভরযোগ্যভাবে যোগাযোগ স্থাপন, তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কোন পদ্ধতিতে ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য ফল পাওয়া যায়, তা বোঝাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি সফল হলে দূরবর্তী অঞ্চল, বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্র কিংবা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা রোবটের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি থেকে শেখার সক্ষমতা থাকলে এসব রোবট আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে। তবে সেসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে এখনো অনেক গবেষণা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জীবন্ত নিউরনকে কি সত্যিই নির্ভরযোগ্য কম্পিউটিং উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব? আপাতত গবেষকেরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তাঁদের লক্ষ্য শুধু মস্তিষ্কের মতো দেখতে কোনো চিপ তৈরি করা নয়, বরং জীবন্ত স্নায়ুকোষের শেখার, মানিয়ে নেওয়ার এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতাকে প্রযুক্তির কাজে লাগানো।
রোবট কুকুরের এই পরীক্ষা সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। গবেষণাটির ফলাফল এখনো পিয়ার রিভিউ বা সমপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যায়নি। তবে এটি ২০২৬ সালের নিউরআইপিএস সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং গবেষণাপত্রটি আর্কাইভে প্রকাশ করা হয়েছে।