ইব্রাহিম কারাগুল
বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মাস হয়ে উঠতে পারে নভেম্বর ও ডিসেম্বর...
আমরা কি ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়ের মধ্যে প্রবেশ করেছি?
আমাদের চারপাশে তিন দিক থেকে যারা ‘ফ্রন্ট’ বা যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে, তাদের বলছি—গত এক হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকান, সেটুকুই যথেষ্ট।
১. নভেম্বর ও ডিসেম্বর বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মাস হয়ে উঠতে পারে। পারমাণবিক হামলাসহ এমন সব আক্রমণ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে।
২. ইসরাইলের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধ্বংসাত্মক সামরিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই সপ্তাহান্তসহ যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
৩. ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর ‘প্রচলিত ধারণার বাইরে নতুন কৌশলে’ হামলার পরিকল্পনা করছে, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য আমরা প্রস্তুত’—এমন বক্তব্যের সময়টিও বিশেষভাবে লক্ষ করা প্রয়োজন।
৪. গত সপ্তাহে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের তেহরান সফর এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা আশা করি, এসব সফরের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক বলয়ের বাইরে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিসরে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও গুরুত্ব পাবে।
৫. এমন বৈশ্বিক ঝড়ের মধ্যে তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর সংস্থা (অর্গানাইজেশন অব তুর্কিক স্টেটস—ওটিএস) একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে সামনে আসা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আঙ্কারার সম্মেলনে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের অনুপস্থিতি তুর্কি বিশ্বের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। অথচ আনাতোলিয়া ও মধ্য এশিয়ার তুর্কি জনগোষ্ঠীর জন্য শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি বড় সুযোগ সামনে এসেছে। এই সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট করা উচিত নয়।
৬. এই উত্তাল পরিস্থিতিতে তুরস্ককে ঘিরে ইসরাইলের ‘অবরোধের কৌশল’ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পেছন দিক দিয়ে ঘুরে এসে তুরস্ককে ঘেরাও করা, অভ্যন্তরীণ সংকট এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বিরোধে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা চলছে। তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলার এই সময়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে হুমকিগুলো আর আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না।
৭. পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিক সাইপ্রাস প্রশাসনের সঙ্গে, এজিয়ান সাগরে গ্রিসের সঙ্গে, পারস্য উপসাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এবং লোহিত সাগরে ইথিওপিয়া-সোমালিল্যান্ডকেন্দ্রিক প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কবিরোধী ফ্রন্ট গড়ে তোলার ইসরাইলি প্রচেষ্টা এখন ককেশাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
৮. আজারবাইজানকে একটি নতুন ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তুরস্ক ও আজারবাইজানের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিছক ব্যক্তিগত ভুল-বোঝাবুঝির চেয়ে অনেক গভীর। এর মধ্যে আনাতোলিয়া ও মধ্য এশিয়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ লক্ষ্যও নিহিত রয়েছে।
৯. ঠিক এই সময়েই তহবিলসংক্রান্ত সংকটের বিস্ফোরণ আমাদের বড় অর্জনগুলোর আড়ালে থাকা বাস্তবতা দেখতে বাধ্য করছে। কে কী অর্জন করেছে, সেটি আলাদা তদন্তের বিষয়। কিন্তু কারা এই পরিকল্পনা তৈরি করেছে, কারা তা পরিচালনা করেছে এবং এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে এর চূড়ান্ত পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১০. তহবিল কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ভেতর থেকে এরদোয়ানকে আঘাত করা, তুরস্কের চারপাশে একের পর এক ফ্রন্ট তৈরি করে বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করা এবং যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে এমন বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে তুরস্ককে ধীর কিংবা সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা কি রয়েছে?
১১. অভ্যন্তরীণ তৎপরতা ও বহিরাগত ফ্রন্টগুলো একই ভাষায় কথা বলছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ইসরাইলি এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্রচেষ্টা চলছে। অথচ তুরস্ক অতীতেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে, বড় ধরনের আঘাত সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য ও পরিকল্পনা যে আর আগের মতো কার্যকর নয়, তা সবাই জানে।
১২. কিন্তু দেশের ভেতরে ও বাইরে কিছু মানুষের কানে নানা গোপন বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন টেবিলে জাল গোয়েন্দা প্রতিবেদন রাখা হচ্ছে। এসবের উৎস ইসরাইল—এমন অভিযোগও রয়েছে। আর কেউ কেউ এসব সাজানো পরিস্থিতি ও পরিকল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
১৩. তুরস্ক একবিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যিক কৌশলগত চিন্তার এক প্রতিনিধিত্বশীল শক্তি। এটি একটি বৃহৎ ও অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ। এখন তুরস্ক এমন একটি রাষ্ট্র, যে এ ধরনের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ। ছোট খেলোয়াড়দের পক্ষে বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়—তুরস্ক সেটিও জানে।
১৪. তুরস্ক নীরব ও ধৈর্যশীল। তারা কখনো আবেগের বশে তাড়াহুড়ো করে না। অপেক্ষা করে। কারণ, অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ব ও এই ভূরাজনৈতিক অঞ্চল কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা রয়েছে। তুরস্ক এসব খেলা, সাজানো পরিকল্পনা ও ছোট ছোট ষড়যন্ত্র ভেঙে দিয়ে পুরো পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তখন কারা বিস্মিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
১৫. গত দশ বছর ধরে ‘এরদোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করো, তুরস্ককে থামাও’—এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এ লক্ষ্যে নেওয়া সব উদ্যোগই ব্যর্থ হয়েছে। বরং তুরস্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেরাও এখন আর আগের অবস্থানে নেই। তারপরও তারা কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে।
১৬. যারা মনে করেন, তুরস্ককে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব, তারা বড় ভুল করছেন। জাতিগুলোর ইতিহাসের গতিপথ এবং ভূরাজনীতির অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিচ্ছি। এ জন্য গত এক হাজার বছরের ইতিহাসই যথেষ্ট। ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থীদের এই সূত্র বা কৌশল শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজেদের জন্যও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
১৭. আগামী দুই মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো ঘটনা ঘটতে পারে। রাষ্ট্র ভেঙে যেতে পারে, নগরী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। প্রত্যেকেরই ভালোভাবে উপলব্ধি করা উচিত—প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ এবং প্রতিটি গৃহীত অবস্থানের মূল্য অত্যন্ত চড়া হতে পারে।
১৮. সবাইকে সব ধরনের অস্বাভাবিক ও আকস্মিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে, যাদের স্থলবাহিনীর ইতিহাস ২ হাজার ২৩৫ বছরের পুরোনো সেই তুরস্কের বিরুদ্ধেও যারা বিভিন্ন ফ্রন্ট তৈরি করছে, তাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। শিগগিরই আমরা এসব পরিকল্পনা ও দৃশ্যপট উল্টে যেতে দেখব। আগামী একশ বছরের ইতিহাসের গতিপথ এসব ষড়যন্ত্রের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে না।