Image description

নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে কার্যত দুর্গে পরিণত হচ্ছে রাজধানী। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর প্রগতি ময়দানের ভারত মণ্ডপমে বসবে দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সম্মেলনে যোগ দেবেন ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির নেতা , অংশীদার দেশ ও আমন্ত্রিত প্রতিনিধিরা। তাদের নিরাপত্তায় ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মীর পাহারায় ঘিরে ফেলা হচ্ছে দিল্লি।   এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার দিল্লি পুলিশের সদস্য, বাকিরা আধাসামরিক বাহিনীর। নিরাপত্তাব্যবস্থায় থাকছেন ১০০- র বেশি এনএসজি কমান্ডোও।  আগামী কাল থেকেই মাঠে নামবেন তারা। বিমানবন্দর, রাষ্ট্রনেতাদের হোটেল এবং সম্মেলনস্থল - এই তিনটি এলাকাকেই রাখা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তার আওতায়।

চাণক্যপুরীর হোটেল ঘিরে কড়া নিরাপত্তা 

নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে কূটনৈতিক এলাকা চাণক্যপুরীর একাধিক অভিজাত হোটেলে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের জন্য আলাদা হোটেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চীন ও রাশিয়ার নিরাপত্তা দল ইতিমধ্যেই দিল্লিতে পৌঁছে গিয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অস্ত্র। শি জিনপিংয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা। পুতিন যে হোটেলে থাকবেন, সেখানে আলাদা করে এক জন উপ-পুলিশ কমিশনার এবং দুই জন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে বিভিন্ন পালায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রনেতাদের থাকার হোটেলের কর্মীদেরও যাচাই করা হয়েছে।

লীলা থেকে ইম্পেরিয়াল, সব হোটেলেই নজরদারি 

নিরাপত্তার তালিকায় রয়েছে লীলা প্যালেস, ললিত নয়াদিল্লি, আইটিসি মৌর্য, তাজ প্যালেস, ওবেরয় এবং ইম্পেরিয়াল-সহ একাধিক হোটেল। রাষ্ট্রনেতাদের থাকার তলা থেকে ছাদ এবং নীচের অংশ সহ সব জায়গাতেই নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন থাকবে। পুতিনের নিরাপত্তায় বিশেষ বিমান, সাঁজোয়া গাড়ি, নিরাপত্তা সজ্জিত কনভয় এবং ছাদে স্নাইপার মোতায়েনের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। আকাশপথে ড্রোন বা অন্য উড়ন্ত বস্তুর গতিবিধির উপরেও নজর থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ গাড়িতে জিপিএস ও অত্যাধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ভিআইপি কনভয়ের গতিবিধি জিপিএসের মাধ্যমে নজরে রাখার পাশাপাশি মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তিন দিন আগেই নামল রুশ বিমান

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বরই ব্রিকস সম্মেলনের নিরাপত্তা প্রস্তুতির ছবি আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাশিয়ার তিনটি পরিবহণ বিমান নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। পুতিনের নিজস্ব গাড়ি ও কনভয়ের গাড়িও বিমানে করে আনার প্রস্তুতি রয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর পুতিনের দিল্লিতে আসার কথা। ১২ সেপ্টেম্বর চিনপিং ভারতে আসবেন। দীর্ঘ সাত বছর পর তাঁর ভারত সফর হতে চলেছে। এর আগে ২০১৯ সালে তিনি ভারতে এসেছিলেন। লাদাখে ভারত- চিন সামরিক সংঘাতের পর এটাই তাঁর প্রথম ভারত সফর।

মোদি- পুতিন বৈঠক

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা শুক্রবার। বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সহ আরও বিস্তৃত বিষয়ে দুই নেতার আলোচনা হতে পারে। একই দিনে মোদির সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানেরও বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। শনিবার শি চিনপিংয়ের সঙ্গে মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা। শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রিকস ব্যবসায়ী সম্মেলনেও বক্তব্য রাখবেন মোদি। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গয়াল এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করেরও উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য রাখার কথা। কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হবে।

মূল সম্মেলন শুরু শনিবার । স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রনেতাদের ভারত মণ্ডপমে পৌঁছনোর কথা। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে শুরু হবে বহুপাক্ষিকতা নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক। বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে রাষ্ট্রনেতারা ‘ভারত ইনোভেটস’ প্রদর্শনী দেখবেন। বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে হবে রাষ্ট্রনেতাদের পারিবারিক ছবি তোলা এবং তার পাঁচ মিনিট পর যৌথ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রধানমন্ত্রী মোদির দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন অতিথিরা।

রবিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে ব্রিকসের অংশীদার দেশ এবং আমন্ত্রিত দেশগুলির রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধিদের ভারত মণ্ডপমে পৌঁছনোর কথা। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে হবে আবারও পারিবারিক ছবি তোলা হবে। ১০টা ৫০ মিনিটে শুরু হবে উন্মুক্ত অধিবেশন। সেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব অর্থনৈতিক বিকাশ, স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হবে। সম্মেলনের শেষে গৃহীত হওয়ার কথা ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’। যাতে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত এবং  ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অঙ্গীকারগুলি থাকবে।

১১ সদস্য দেশের নেতাদের সমাবেশ 

এ বারের ব্রিকস গোষ্ঠীতে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সম্মেলনে বহুপাক্ষিকতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শক্তি ও খাদ্যনিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিশ্ব পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থিতিস্থাপকতা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়ও আলোচনায় থাকবে। সদস্য দেশগুলি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়েও মতবিনিময় করতে পারে।

আলাদা হোটেলে বিভিন্ন দেশের অতিথিরা 

নিরাপত্তার পাশাপাশি অতিথিদের থাকার ব্যবস্থাতেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম- জোমার্ট তোকায়েভ এবং থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে নির্দিষ্ট হোটেলে রাখা হচ্ছে। আবুধাবির যুবরাজ এবং সৌদি আরব, বাহরাইন ও ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রীরাও আলাদা নিরাপত্তা-বলয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের অতিথিদের জন্যও নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪,৮০০ ট্রাফিক পুলিশ

রাষ্ট্রনেতাদের যাতায়াত ঘিরে দিল্লির যান চলাচলেও বড় পরিবর্তন আসছে। প্রায় ৪,৮০০ ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে বিদেশি প্রতিনিধিদের আগমন শুরু হয়ে তাদের বিদায় পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে যান নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা বন্ধ বা ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। ৩৫ টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এই ব্যবস্থার আওতায় থাকবে এবং ২২টি ডাইভারশন পয়েন্ট রাখা হয়েছে।

সর্দার পটেল মার্গ, মাদার টেরেসা ক্রিসেন্ট, তিনমূর্তি মার্গ, আকবর রোড, তিস জানুয়ারি মার্গ, রাজেশ পাইলট মার্গ, সুব্রামানিয়াম ভারতী মার্গ, মথুরা রোড, মতিলাল নেহরু মার্গ, ড. জাকির হুসেন রোড, জনপথ, অশোকা রোড, বারাখাম্বা রোড, টলস্টয় মার্গ, নীতি মার্গ, এপিজে আবদুল কালাম রোড, প্রেস এনক্লেভ রোড এবং লালবাহাদুর শাস্ত্রী মার্গ- সহ একাধিক রাস্তায় পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ বা যান ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে।

৫০০ ক্যামেরায় নজরদারি

নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় ৫০০টি নজরদারি ক্যামেরা ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্যের আদানপ্রদান এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য হুমকি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে ভারত মণ্ডপম এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রনেতাদের অন্য গন্তব্যে যাওয়ার পথও আগে থেকে খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলির পুলিশের সঙ্গেও সমন্বয় রাখা হচ্ছে।

তবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে যে, সাধারণ মানুষের অসুবিধা যতটা সম্ভব কম রেখেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের যাতায়াতের সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী যান নিয়ন্ত্রণ করা হবে। নিরাপত্তার পাশাপাশি শহরের স্বাভাবিক জনজীবন যাতে সচল থাকে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

বিশেষ খাবার 

অতিথিদের নিরাপত্তার পাশাপাশি খাবার নিয়েও থাকছে বিশেষ আয়োজন। প্রাতরাশে থাকছে বাজরা ও অন্যান্য শস্যের তৈরি খাবার - রাগির দোসা, বাজরার উপমা, মিলেট পঙ্গল, মরসুমি ফল, ডাবের জল ও ঘোল। দুপুরে গুজরাতি, রাজস্থানি ও দক্ষিণ ভারতীয় থালি, কাশ্মীরি পুলাও, দাক্ষিণাত্যের মশলা, হায়দরাবাদি নিরামিষ ও আমিষ বিরিয়ানি এবং দক্ষিণ ভারতীয় ঝোল পরিবেশনের পরিকল্পনা রয়েছে। রাতের মেনুতে থাকবে আওয়াধি কাবাব, তন্দুরি পদ এবং ধীরে রান্না করা বিভিন্ন ভারতীয় পদ। নিরামিষ ও আমিষ খাবারের জন্য আলাদা বিভাগ এবং পৃথক রাঁধুনির ব্যবস্থাও থাকবে।

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি 

সব মিলিয়ে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনকে সামনে রেখে দিল্লির নিরাপত্তা, যান চলাচল এবং আতিথেয়তার প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে এসেছে। ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী, বিশেষ নিরাপত্তা দল, আধাসামরিক বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ, গোয়েন্দা নজরদারি, ক্যামেরা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, ড্রোন ও জিপিএস নির্ভর নজরদারির মধ্যে দিয়েই রাজধানীতে বসতে চলেছে এই বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্মেলন।