Image description

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা সম্ভবত মার্কিন অস্ত্রের সরাসরি আঘাতে ঘটেছে বলে দাবি করেছেন অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা। রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে তারা এ মত দিয়েছেন।

মঙ্গলবার ছোট শহর কুহেস্তাকে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। চার সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির ধরন কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পর অস্ত্রের প্রতিফলিত আঘাতের চেয়ে সরাসরি আঘাতের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তিনজনের ধারণা, ব্যবহৃত অস্ত্রটি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে মার্কিন অস্ত্র হতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত কারণ ও অস্ত্রের ধরন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

 
 

১ সেপ্টেম্বর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে আইআরজিসির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক হামলা চালানোর কথা জানায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। কুহেস্তাক এলাকার একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও ওই হামলার লক্ষ্য ছিল বলে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

 
 

স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটিতে আঘাত হানা হয়।

 

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার বলেছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা ঘটনাটির বিষয়ে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী দুই সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানের তিন অতিথি ৪৩ বছর বয়সী কলসুম মোল্লাহী নাজহানদানিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি এবং চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমি রয়েছেন। ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মল্লাহী যোগাযোগ টাওয়ারের কাছে মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় নিহত হন বলে জানানো হয়েছে।

ইরানে চলমান সংঘাতে বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে এ ঘটনা। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল ইরানি কর্তৃপক্ষ।

ওই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওই হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে তারা বলেছেন, হামলাটি সম্ভবত সরাসরি আঘাত ছিল; কাছের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে বাড়িটিতে আঘাত করার সম্ভাবনা কম।

১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, হামলার পর প্রত্যক্ষদর্শীদের বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাপ দিয়েছিল। রয়টার্স মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে।

রয়টার্সকে দেওয়া এক ভয়েস বার্তায় এক বাসিন্দা জানান, অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ ছিলেন এবং হামলার পর আহতদের অনেকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, কাছের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি সামরিক স্থাপনা নয়; এটি সিরিক কাউন্টির বাসিন্দাদের মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে।

অস্ত্র বিশ্লেষক ট্রেভর বল বলেন, বাড়িটির ছাদে বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখে মনে হচ্ছে কোনো অস্ত্র সরাসরি ছাদে বা ছাদের ঠিক ওপর বিস্ফোরিত হয়েছে। তার মতে, কাছের যোগাযোগ টাওয়ারে হামলার ফলে ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ দিয়ে এমন ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তিনি অস্ত্রটি মার্কিন বলে মনে করছেন।

আরেক বিশেষজ্ঞ কলেটের মতে, প্রমাণের ভার একটি মার্কিন ৫০০ পাউন্ডের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে। অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক সেবাস্টিয়ান শুটও বলেন, ছাদের ক্ষতির ধরন টেলিযোগাযোগ টাওয়ার থেকে অস্ত্রের আঘাত ছিটকে আসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিন বিশেষজ্ঞই বলেছেন, বাড়িটি কোনো ভুল করে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়েছে, এমন সম্ভাবনা কম। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষকে ট্রেভর বল মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত জেএসওডব্লিউ ধরনের গ্লাইড বোমার অংশ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে এসব ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাকের ওই বাড়িতে হামলারই অংশ ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

এদিকে হামলায় নিহতদের স্মরণে বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সিরিকের পরিস্থিতি শোকাবহ এবং হামলার পরও মানুষ এখনো গভীরভাবে হতবাক।

ছয় মাসের চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাডার ও যোগাযোগ স্থাপনায় একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানি সামরিক হুমকি ঠেকাতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স