Image description

নেপালের ভয়াবহ বন্যা শুধু দেশটির জন্যই নয়, প্রতিবেশী ভারতের জন্যও বড় ধরনের সতর্কবার্তা তৈরি করেছে। হিমালয় থেকে উৎপন্ন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী নেপালের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করায় নেপালে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের বন্যার জন্য শুধু নেপাল থেকে নেমে আসা পানিকে দায়ী করা ঠিক নয়।

নেপাল ও ভারতের নদী ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নেপালের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা নদীগুলোর মধ্যে কোশি, গণ্ডক ও কর্ণালী গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে প্রবেশের পর এগুলো যথাক্রমে বিহার ও উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত গঙ্গা নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নেপালে অতিবৃষ্টির কারণে নদীগুলোতে দ্রুত পানি বাড়লে সীমান্তবর্তী ভারতের নদীগুলোতেও পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। কিন্তু ভারতে বন্যার ভয়াবহতা কতটা হবে, তা নির্ভর করে আরও কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে ভারতের নিজস্ব বৃষ্টিপাত, নদীর পানি কতটা উঁচুতে রয়েছে, বাঁধ ও তীররক্ষাব্যবস্থার অবস্থা এবং শহর ও জনবসতির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নেপাল পানি ছেড়ে দিয়েছে, তাই ভারতে বন্যা হয়েছে’—এ ধরনের সরল ব্যাখ্যা বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। নেপালে বিপুল পরিমাণ পানি নিয়ন্ত্রণ করে ভারতে ছেড়ে দেওয়ার মতো বড় জলাধার নেই। বরং নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলে প্রাকৃতিকভাবেই নদীগুলোর পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে।

২০০৮ সালের কোশি বন্যা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সে সময় নেপালে কোশি নদীর বাঁধ ভেঙে ভারতের বিহারে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ওই ঘটনা দেখিয়েছে, শুধু নদীতে পানির পরিমাণ নয়, বাঁধ ও তীররক্ষা অবকাঠামোর দুর্বলতাও বন্যাকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

ভারতের বিহার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঘাঘরা, রাপ্তি ও গণ্ডকের মতো নদীগুলো বর্ষাকালে এসব অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা বাড়ায়। উত্তরাখণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকাও হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর আকস্মিক পানিপ্রবাহের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

তবে এবারের নেপালের দুর্যোগ শুধু সাধারণ নদীবন্যার বিষয় নয়। হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ, পাথর, মাটি ও পানির আকস্মিক স্রোত ভয়াবহ ‘ক্যাসকেডিং’ দুর্যোগ তৈরি করতে পারে। কোনো হিমবাহ বা পাহাড়ের অংশ ধসে নদীতে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে ধেয়ে আসতে পারে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পানিপ্রবাহও দ্রুত বদলে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়লে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ফলে নেপালের কোনো বড় দুর্যোগকে শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ভারত ও নেপালের মধ্যে আরও কার্যকর তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। নদীর পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য আকস্মিক বন্যার বিষয়ে আগাম তথ্য দ্রুত বিনিময় করা গেলে সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব।

বিশেষ করে বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নদী পর্যবেক্ষণ, বাঁধ ও তীররক্ষা অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনাকে শুধু জাতীয় সীমারেখার মধ্যে না দেখে ভারত-নেপাল যৌথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা তাই ভারতের জন্য শুধু আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর নয়; এটি হিমালয় থেকে গঙ্গা অববাহিকা পর্যন্ত আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির একটি বড় সতর্কসংকেত।