আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী “Belonging: A Journey of Love” প্রকাশিত হবে দু’মাস এক সপ্তাহ পর আগামী ১০ নভেম্বর। এরই মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে ভারত জুড়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রে মোদি, বিজেপি এবং তার সহযোগী আরএসএস এবং চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বইটিতে রয়েছে,যা ক্ষমতাসীনদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে ভেবে আপত্তির মুখে পড়েছে বইটির প্রকাশনা। পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া সোনিয়া গান্ধীকে বলেছে, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো সংশোধন করে দিতে। কিন্তু তিনি অস্বীকার করায় বিপদে পড়তে চায়নি পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া। তারা বইটি ভারতে প্রকাশ করবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে একযোগে প্রকাশিত হবে এটি এবং প্রাথমিকভাবে এক লাখ কপি মুদ্রিত হবে ৫৪৪ পৃষ্ঠার এই আত্মজীবনী। প্রি-অর্ডার চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮ ডলার এবং যুক্তরাজ্যে ২৫ পাউন্ড।
ভারতের মিডিয়া ছাড়াও বিশ্বজুড়ে মিডিয়ায় গত মাস থেকেই ঝড় উঠেছে সোনিয়া গান্ধীর আত্মজজীবনী নিয়ে। ‘দ্য হিন্দু’র ইউটিউব চ্যানেল বলেছে: “কিতাব হো তো ্এ্যয়সি, জিসমে বিনা ডরে সাচ লিখখা হো, তো ইস কিতাব নে রিলিজ সে পেহলে হি তেহেলা মাচা দিয়া হ্যায়।” (বই হতে হলে এমন হওয়া উচিত, যাতে নির্ভয়ে সত্য লেখা হয়। এই বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।) সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী এখনও প্রকাশিত হয়নি, বাজারে আসেনি, কারও হাতে যায়নি। তা সত্ত্বেও ভারতের রাজনৈতিক গগনে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। সবার মনে প্রশ্ন, কি আছে এই গ্রন্থে।
কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, বিজেপি সরকার রাজনৈতিক সমালোচনা সেন্সর করতে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি ও বিজেপির সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক বিবরণ ঠেকাতে প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিজেপি নেতারা কংগ্রেসের দাবির অস্বীকার করে বরং সোনিয়ার আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপির তথ্যগত নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক সেন্সরশিপ ও ভয়ের ‘মিথ্যা বয়ান’ তৈরির অভিযোগ করেছেন। বিজেপি নেতা মুখতার আব্বাস নকভি বলেছেন, “সোনিয়া গান্ধীর লেখা বইটি স্মৃতিকথা নাকি কল্পকাহিনি, তা লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়। স্মৃতিকথা হিসেবে চিহ্নিত কোনো রচনা যদি কল্পকাহিনি বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকাশক অবশ্যই তা মূল্যায়ন করবেন। আমার মনে হয়, আপনি যদি স্মৃতিকথা হিসেবে উপস্থাপিত কোনো রচনাকে রাজনীতিকরণের চেষ্টা করেন, তাহলে প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই উঠবে।”
হিন্দুস্তান টাইমসের এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, আরএসএস ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শগত উৎস এবং ভারতীয় ভূখন্ডে চীনা বাহিনীর অনুপ্রবেশের উল্লেখে পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর বইয়ের চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া বলেছে যে, তারা বইটির ভারতীয় প্রকাশক নয়। তারা বাইরের চাপের কাছে নতি স্বীকার করার বা লেখক পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করায় কেবল সেই কারণে বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ভারতীয় পত্রপত্রিকা লিখেছে যে, সোনিয়া গান্ধীর জন্য তাঁর আত্মজীবনী রচনার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। শাশুড়ি ও স্বামীর হত্যাাণ্ডের পর ভগ্নহৃদয় তাঁকে ভারতের জনজীবনে ঠেলে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত যাতনা আড়ালে রেখেছিলেন। তাই স্মৃতিকথাটি শুধু রাজনীতি নিয়ে নয় বলেই মনে হচ্ছে। এটি তাঁর পরিচয়, পরিবার, শোক এবং ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও, যে দেশে তিনি ইতালি থেকে এক তরুণী হিসেবে এসেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সোনিয়া গান্ধী বলেছেন বিজেপির হাতে ভারতে গণতন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে।
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার তিন দশক পর সোনিয়া গান্ধী ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন এবং ৭৯ বছর বয়সে তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় নিজের বয়ান তুলে ধরেছেন। তাঁর আত্মজীবনী ভারতে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক বইগুলোর একটি হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেইl