Image description

একদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ‘ঐক্যবদ্ধ ব্রিটেন’ গড়ার বার্তা, অন্যদিকে স্কটল্যান্ড থেকে উঠল ভিন্ন সুর, 'যুক্তরাজ্য ভেঙে পড়ছে।' ক্ষমতায় আসার পর দেশজুড়ে সফর শুরু করা বার্নহ্যামকে নিশানা করে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাজ্য এখন 'বিপজ্জনক অবস্থার' মধ্যে রয়েছে এবং চারটি জাতির বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) নেতা সুইনি দাবি করেছেন, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামো এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম দেশজুড়ে যে সফর করছেন, সেটি মানুষের কথা শোনার সফর নয়, বরং 'বক্তৃতা দেওয়ার সফর' হয়ে উঠেছে।

সুইনির মূল অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে চার দেশের মধ্যে সম্পর্ক আগের মতো শক্ত নেই।

তার যুক্তি, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার দাবিকে ঘিরে সমর্থন বাড়ছে, ওয়েলসে প্লেইড কামরির সরকার ক্ষমতায় এসেছে ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনের নেতৃত্ব রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়েছে৷ এসব ঘটনাই নাকি প্রমাণ করে যে যুক্তরাজ্য 'গভীর অনিশ্চয়তার' মধ্যে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাজ্য বলতে শুধু ইংল্যান্ডকে বোঝায় না; এটি চারটি আলাদা জাতি ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক জোট। কয়েক শতকের ঐতিহাসিক ঐক্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্রে প্রতিটি অংশের রয়েছে নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি ও আলাদা রাজনৈতিক কাঠামো।

স্বাধীনতা গণভোট নিয়ে সংঘাত

সুইনি দীর্ঘদিন ধরেই স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবির অন্যতম প্রধান মুখ। তার দল এসএনপি আবারও স্বাধীনতা গণভোটের দাবি তুলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম এই দাবির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেননি।

সুইনির অভিযোগ, ওয়েস্টমিনস্টারের সরকার স্কটল্যান্ডের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করছে। তার মতে, স্বাধীনতা নিয়ে ভোটের দাবি অস্বীকার করে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

তবে বার্নহ্যামের অবস্থান হলো, যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ একসঙ্গেই থাকা উচিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বারবার বলেছেন, তার সরকার চারটি দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে এবং আঞ্চলিক ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহী।

বার্নহ্যামের ‘ঐক্যের সফর’ নিয়ে বিতর্ক

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অংশ সফর করছেন। উত্তর আয়ারল্যান্ড সফরে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।

কিন্তু সুইনির অভিযোগ, এই সফরে স্থানীয় সরকারের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীকে শুধু নিজের পরিকল্পনা জানালে হবে না, বরং চার দেশের মানুষের মতামতও শুনতে হবে।

ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক

বার্নহ্যাম সরকার যখন অর্থনীতি, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চাইছে, তখন সামনে আসছে আরেক বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা।

বিশ্লেষকদের মতে, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবি নতুন নয়। তবে ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে বার্নহ্যাম সরকারের সামনে শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, রয়েছে সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষাও।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন যে বার্তা দিতে চাইছেন তা হলো, বিভাজন নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন ব্রিটেন তৈরি করা। কিন্তু সুইনির মতো আঞ্চলিক নেতাদের প্রশ্ন, সেই সহযোগিতায় স্কটল্যান্ডসহ চার দেশের কণ্ঠ কতটা গুরুত্ব পাবে?

ব্রিটেনের রাজনৈতিক মানচিত্রে তাই নতুন করে উঠছে পুরোনো প্রশ্ন, একসঙ্গে থাকবে যুক্তরাজ্য, নাকি স্বাধীনতার দাবির ঢেউ আরও জোরালো হবে?