‘বাবা, আমি কি সত্যিই একদিন রাজকন্যা হতে পারব?’ ছোট্ট মেয়ের এমন প্রশ্ন শুনে হয়ত বেশির ভাগ বাবা-মা হেসে বলবেন, ‘অবশ্যই পারবে।’ তারপর বিষয়টি সেখানেই শেষ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার কৃষক জেরেমাই হিটনের গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি। মেয়ে এমিলির প্রশ্নের উত্তর শুধু মুখে দিতে চাননি তিনি।
সত্যিই যদি রাজকন্যা হতে হয়, তাহলে তো দরকার একটি রাজ্য। আর সেই রাজ্যের খোঁজ করতে গিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত মরুভূমিতে। মিশর ও সুদানের সীমান্তবর্তী বির তাওয়িল নামের প্রায় ২ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটারের একটি ভূখণ্ডকে বেছে নিলেন তিনি।
ঘটনার শুরু ২০১৪ সালের শুরুর দিকে। তখন এমিলির বয়স ছয় বছর। রাজকন্যাদের গল্পে মুগ্ধ মেয়েটি একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করে বসে—সে কি কোনোদিন সত্যিকারের রাজকন্যা হতে পারবে কি না। জেরেমাই মেয়ের কথাকে শিশুসুলভ কল্পনা হিসেবে উড়িয়ে দেননি। বরং তিনি খুঁজতে শুরু করেন, পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা আছে কি-না, যেটিকে কোনো রাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করছে না। খোঁজ করতে গিয়ে তার নজরে আসে বির তাওয়িল।
মিশর ও সুদানের সীমান্তের মাঝখানে অবস্থিত এই শুষ্ক মরুভূমি অঞ্চলটি ঐতিহাসিক সীমান্ত জটিলতার কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। জেরেমাইয়ের কাছে জায়গাটি যেন মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য তৈরি একটি সুযোগ। তিনি কায়রো যান এবং সেখান থেকে বির তাওয়িলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। অবশেষে ১৬ জুন, এমিলির সপ্তম জন্মদিনে তিনি সেখানে পৌঁছান। মরুভূমির বুকে পতাকা পুঁতে ঘোষণা করেন নিজের ‘রাজ্য’।
বির তাওয়িল এলাকা নিয়ে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির শুরু এক শতাব্দীরও বেশি আগে। ১৮৯৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে মিশর ও সুদানের সীমান্ত নির্ধারণ করে একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়। সেই সীমারেখা অনুযায়ী বির তাওয়িলকে তৎকালীন অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান সুদানের অংশ এবং পাশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হালায়েব ট্রায়াঙ্গলকে মিশরের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
তবে ১৯০২ সালে ব্রিটিশরা স্থানীয় প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় আরেকটি সীমারেখা নির্ধারণ করে। এতে আগের মানচিত্রের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায়—বির তাওয়িলকে মিশরের প্রশাসনের অধীনে এবং হালায়েব ট্রায়াঙ্গলকে সুদানের প্রশাসনের অধীনে রাখা হয়।
পরবর্তীতে মিশর ও সুদান নিজ নিজ দাবির পক্ষে দুই ভিন্ন সীমারেখাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। মিশর ১৮৯৯ সালের সীমারেখা অনুসরণ করে হালায়েব ট্রায়াঙ্গলের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে। অন্যদিকে সুদান ১৯০২ সালের প্রশাসনিক সীমারেখাকে ভিত্তি ধরে একই অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
দুই দেশের এই পরস্পরবিরোধী দাবির ফলেই বির তাওয়িল এক অদ্ভুত অবস্থানে পড়ে যায়। কারণ, এক দেশের দাবি করা সীমারেখা মেনে নিলে বির তাওয়িল অন্য দেশের অংশ হয়ে যায়, আবার অন্য সীমারেখা মানলে সেটি প্রথম দেশের ভূখণ্ডে পড়ে। ফলে হালায়েব ট্রায়াঙ্গলের দাবি ধরে রাখতে গিয়ে কোনো দেশই বির তাওয়িলকে আর নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করছে না।
এই অদ্ভুত সীমান্ত-জটিলতাকেই নিজের ‘রাজ্য’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন জেরেমাই। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। কোনো রাষ্ট্র কোনো ভূখণ্ডকে নিজেদের বলে দাবি না করলেই সেটি আইনগতভাবে ‘কারও নয়’—এমনটা ধরে নেয়া যায় না। বির তাওয়িলের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও ব্যবহারিক সম্পর্কও রয়েছে।
জেরেমাইয়ের ঘোষণা যতটা চমকপ্রদ, আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা ততটাই কঠিন। কোনো ভূখণ্ডে গিয়ে পতাকা পুঁতে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করলেই সেটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র হয়ে যায় না। একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, কার্যকর সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয়, অন্য রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই জায়গাতেই ‘কিংডম অব নর্থ সুদান’ বড় বাধার মুখে পড়ে। মিশর কিংবা সুদান—কোনো দেশই জেরেমাইয়ের ঘোষিত রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে এটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি।
তবুও জেরেমাই তার পরিকল্পনা চালিয়ে যান। ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেন জেরেমাই। জাতিসংঘের কাছে পর্যবেক্ষক সত্তার মর্যাদা পাওয়ার আবেদন করার কথাও জানান। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের উদ্যোগ নেন। এমনকি তার ঘোষিত রাজ্য পরে ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যবর্তী এলাকায় নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ‘লিবারল্যান্ড’-কেও স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু জেরেমাইয়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল শুধু একটি পতাকা, রাজমুকুট কিংবা মানচিত্রে একটি নাম যোগ করা নয়। তিনি বির তাওয়িলে একটি বড় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জেরেমাইয়ের পরিকল্পিত অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ সেন্টার বা এআরসির লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, কৃষিবিজ্ঞান ও খাদ্য উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করা।
তার ভাষায়, এটি হবে আধুনিক সময়ের ‘নোয়ার আর্ক’—বিশ্বের ভবিষ্যৎ খাদ্যসংকট মোকাবিলায় নতুন সমাধান খোঁজার একটি কেন্দ্র। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে ভবিষ্যতে এক হাজারের বেশি বিজ্ঞানীকে নিয়ে কাজ করার কথা ছিল। এ জন্য বিজ্ঞানীদের একটি ডাটাবেস তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়।
জেরেমাইয়ের যুক্তি ছিল, বিশ্বের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু পরীক্ষা করতে হবে। আর সেই পরীক্ষার জন্য বির তাওয়িলের মতো কঠিন পরিবেশই হতে পারে উপযুক্ত জায়গা।
এই বড় পরিকল্পনার সঙ্গে ছিল বড় অর্থের প্রয়োজনও। জেরেমাই অনলাইনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করা হয়। তার হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ২০০ কোটি ডলার।
তিনি তার উদ্যোগকে বিশ্বের প্রথম ‘ক্রাউডফান্ডেড রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। অনুদানের বিনিময়ে রাখা হয়েছিল বেশ কিছু অভিনব সুবিধা। ২৫ ডলার দিলে সম্মানসূচক অভিজাত উপাধি, ১ হাজার ডলারে কোনো শহরের একটি সড়কের নাম নিজের নামে করার সুযোগ—এমন প্রস্তাব ছিল। আরও বড় অঙ্কের অর্থ দিলে ভবিষ্যতের বিমানবন্দর বা রাজধানীর নামকরণের অধিকার পাওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছিল।
এমনকি ২ হাজার ৫০০ ডলারের অনুদানের বিনিময়ে নিউইয়র্কে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে জেরেমাইকে টানা ৪৮ ঘণ্টা জাস্টিন বিবারের গান শোনানোর মতো অদ্ভুত প্রস্তাবও ছিল। জেরেমাইয়ের আশা ছিল, প্রাথমিক তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকল্পটির বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে এবং পরে বড় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবেন।
কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আইনি প্রশ্নের বাইরেও ছিল প্রকৃতির বাধা। বির তাওয়িল পৃথিবীর অন্যতম প্রতিকূল মরুভূমি অঞ্চল। সেখানে বড় আকারে কৃষি প্রকল্প চালু করতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পানি নিয়ে।
জেরেমাই দাবি করেছিলেন, ওই অঞ্চলের ভূগর্ভে পানির উৎস রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সেখানে থাকা পানি যদি প্রাচীন বা ‘ফসিল ওয়াটার’ হয়, তাহলে একবার ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হলে তা দ্রুত পুনর্ভরণ হবে না। এ ছাড়া নীল নদ অববাহিকায় পানি ব্যবহারের বিষয়টি মিশর ও সুদানের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি প্রতিকূল মরুভূমিতে নতুন রাষ্ট্র বানিয়ে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করার চেয়ে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করাই বাস্তবসম্মত। জেরেমাইয়ের দাবি ছিল, তিনি মিশর বা সুদানের কোনো ভূখণ্ড দখল করছেন না। তার যুক্তি, ঐতিহাসিক সীমান্তরেখার হিসাব অনুযায়ী বির তাওয়িল কারও নয়।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ মিশর বা সুদান যদি মনে করে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ভূখণ্ডগত দাবির নজির তৈরি করতে পারে, তাহলে তারা সেটিকে সহজে মেনে নেবে না।
সীমান্তের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো দেশই এমন একটি নজির তৈরি করতে চাইবে না, যা ভবিষ্যতে অন্য কোনো ভূখণ্ড নিয়ে নতুন দাবি তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ‘কিংডম অব নর্থ সুদান’ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি। এমিলিও কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্রের রাজকন্যা হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু জেরেমাই হিটনের গল্পটি আজও আলাদা করে মনে রাখার মতো। কারণ এটি শুধু একটি অদ্ভুত রাষ্ট্র ঘোষণার গল্প নয়। এর শুরু হয়েছিল একটি শিশুর খুব সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে। ‘বাবা, আমি কি সত্যিই একদিন রাজকন্যা হতে পারব?’ সেই প্রশ্নের উত্তরে জেরেমাই শুধু ‘হ্যাঁ’ বলেননি। তিনি মানচিত্র খুলেছেন, মরুভূমি খুঁজে বের করেছেন, হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছেন, পতাকা পুঁতেছেন এবং মেয়েকে সত্যিই একটি ‘রাজ্য’-এর রাজকন্যা ঘোষণা করেছেন।
রাজ্যটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। স্বপ্নটি বাস্তব রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। তবু এমিলির শৈশবের গল্পে হয়ত সেই দিনটিতে সত্যিই একটি রাজ্য তৈরি হয়েছিল—যে রাজ্যের সীমানা কোনো মানচিত্রে নয়, ছিল একজন বাবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভেতর।
সূত্র: আল জাজিরা, ‘কিংডম অব নর্থ সুদান প্রতিষ্ঠার গল্প’, প্রতিবেদক জো জ্যাকসন, প্রকাশিত: ১১ মে ২০১৫।