আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শহর নিউইয়র্ক। কিন্তু এই শহরের বুকেই রয়েছে এমন এক সম্প্রদায়, যাদের জীবনযাপন আধুনিকতার চেয়ে বহু শতাব্দী পুরোনো ধর্মীয় রীতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরা হচ্ছেন হাসিদিক ইহুদি—কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিজেদের আলাদা সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই যাদের জীবন আবর্তিত হয়।
সম্প্রতি তুরস্কের জনপ্রিয় ইউটিউবার ও ভ্রমণ ব্লগার মুহাম্মদ রুহি চেনেট হাসিদিক ইহুদিদের কঠোর জীবন-যাপন তুলে ধরেছেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, এই সম্প্রদায়ের সাক্ষাতে যাওয়া রুহিকে সবাই জিঙ্গেস করছেন আপনি ইহুদি কিনা। অর্থাৎ সম্প্রদায়টি এতটাই এক ঘরে জীবনযাপন করে যে, তারা স্বাভাবিকভাবে অ-ইহুদিদের সঙ্গে চলাফেরা কিংবা সাক্ষাৎ করতে চান না। তিনি বলেন, ‘আমরা যতই গভীরে যাই ততই আমাদের মনে হয়—আমরা এখানে বেমানন। আমাদের দেখলেই তারা
সবার প্রথম একই প্রশ্ন করেন। আপনি কি ইহুদি?
টিভি-ইন্টারনেট থেকে দূরে
রুহি জানান, এখানকার সদস্যরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। আধুনিক বিশ্বের নানা বিষয়ে তাদের জ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত। বিশেষভাবে তৈরি মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে ইন্টারনেটের বিভিন্ন সুবিধা সরিয়ে বা ফিল্টার করে দেওয়া হয়, যাতে ব্যবহারকারীরা কেবল অনুমোদিত সেবা নিতে পারেন।
এক ইহুদিকে রুহি জিজ্ঞেস করেন আপনি সারা জীবনে কখনো ইন্টারনেট ব্যবহার
করেছেন?
উত্তরে তিনি জানান, একজন মানুষের জন্য এটা সবচেয়ে বিপদজনক বিষয়।
একই উত্তর দেন তিনি জীবনে কখনো টেলিভিশন দেখেছেন কিনা প্রশ্নের ক্ষেত্রেও।
তিনি প্রশ্ন করেন, আপনি মাইকেল জ্যাকসন কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্দোকে চেনেন কিনা, উত্তরে ওই ইহুদি বলেন, তিনি জানেন না।
নিজস্ব কমিউনিটি টহল বাহিনী
হাসিদিক ইহুদিদের এদের নিজস্ব কমিউনিটি টহল বাহিনী রয়েছে, যারা কিছু পরিস্থিতিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতই দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এছাড়াও তাদের
নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং ধর্মীয় আদালত রয়েছে। তারা কাউকে আটকে রাখতে
পারে। আর এখন নিরাপত্তা আরো জোরদার করার জন্য তারা এ ধরনের বিভিন্ন অনুমতিও
পাচ্ছে।
এখানে শালীনতা টহল নামে পরিচিত স্বেচ্ছাসেবী দলগুলো কখনো কখনো দেখে যে হাসিদিক সম্প্রদায়ের অন্য সদস্যরা জনসম্মুখে উপযুক্ত পোশাক পড়েছে কি না।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও রয়েছে আলাদা কাঠামো। ১৩ বছর বয়সে ছেলেদের বার মিৎসভা সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের পোশাকে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর ধর্মীয় শিক্ষাই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের প্রধান অংশ। হাইস্কুল পর্যায়ে সাধারণ একাডেমিক বিষয় পড়ানোর পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অধিক সন্তান জন্ম
এই সম্প্রদায়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য তাদের উচ্চ জন্মহার। ডকুমেন্টারিতে বলা হয়েছে, সম্প্রদায়টির জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ এবং জন্মহার এত বেশি যে প্রতি বছর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একজন নারী যিনি একসময় এক রাব্বায়ের স্ত্রী ছিলেন। পরে হাসিদিক সম্প্রদায় ছেড়েছেন। তিনি জানান, বিয়ের সাড়ে আট মাসের মধ্যে তার প্রথম সন্তান এবং ১১ মাস পর দ্বিতীয় সন্তান হয়। তিনি আরো জানান, তার এখন ১০ জন সন্তান রয়েছে এবং তিনি যদি বিরতি না নিতেন তবে তার ১৫টি সন্তান হতে পারত। সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরকে রাব্বির অনুমতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
মহিলাদের চুল কামিয়ে রাখা
হাসিদিক সম্প্রদায়ের বিবাহিত নারীকে কঠোর প্রথা অনুসরণ করে মাথার চুল কামিয়ে ফেলতে হয়, বাইরে বের হলে তারা উইক বা ওড়া দিয়ে চুল ঢেকে রাখেন।
এখানকার মহিলারা বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে একা থাকা অবস্থায়ও চুল ঢেকে রাখেন।
বিবাহিত দম্পতিরা প্রতি মাসে অর্ধেক সময় তারা একে অপরকে স্পর্শও করে না এমনকি
তারা হাতে হাতে জিনিস আদান প্রদানও করে না।
শুধু পরিবার নয়, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনেও সম্প্রদায়টির রয়েছে নিজস্ব ব্যবস্থা। স্থানীয়দের মধ্যে কেনাকাটা ও ব্যবসা নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। শিশুদের খেলনা ও অন্যান্য পণ্যও অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়।
সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে ধর্মীয় আদালত বা ‘বেদ্রিন’। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অবস্থান হারানোর আশঙ্কায় সদস্যদের জন্য এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া কঠিন বলে ডকুমেন্টারিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পুলিশের কাছে যাওয়ার আগেও বিষয়টি রাব্বির সঙ্গে আলোচনা করার রীতি রয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস, কঠোর সামাজিক নিয়ম, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বড় পরিবার—সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের হাসিদিক ইহুদি সম্প্রদায় যেন আধুনিক নগরজীবনের মাঝেই গড়ে তোলা এক পৃথক জগত। বাইরে থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের হলেও জীবনযাপন, শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক কাঠামোর দিক থেকে তাদের পৃথিবী অনেকটাই আলাদা।