ব্রিটেন কি এ বার সরাসরি রাশিয়ার নিশানায়? প্রশ্নটির উত্তর ‘হ্যাঁ’ও বললেন না, ‘না’ও বললেন না ভ্লাদিমির পুতিন। বদলে মাত্র দু’টি শব্দে রহস্য আরও বাড়িয়ে দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট, ‘সামরিক গোপন কথা’। ইউক্রেনকে দূরপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত নকশা দিতে ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের পর এমন মন্তব্য নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে লন্ডন-মস্কো সম্পর্কে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার রাতে জানা যায়, কিরগিজস্তানে একটি সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পুতিনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনায় হামলার কথা রাশিয়া বিবেচনা করছে কি না। জবাবে পুতিন বলেছেন, ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া কী করবে, তা ‘সামরিক গোপন কথা’। এরপর এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
পুতিনের এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে ব্রিটেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্ত। গত ২৪ আগস্ট কিয়েভ সফরে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তার ঘোষণা দেন। এর আওতায় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমবিডিএকে স্ক্যাল্প ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত ব্রিটিশ যন্ত্রাংশের গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশের অনুমতি দিচ্ছে লন্ডন। স্ক্যাল্প হলো ব্রিটেনের স্টর্ম শ্যাডোর ফরাসি সংস্করণ। এই প্রযুক্তি হাতে পেলে ফ্রান্সের সহযোগিতায় ইউক্রেন নিজ দেশেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।
লন্ডনের এই সিদ্ধান্তে শুরু থেকেই ক্ষুব্ধ মস্কো। গত বৃহস্পতিবার মস্কোয় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইউক্রেনকে স্পর্শকাতর ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দিয়ে তারা ‘আগুন নিয়ে খেলছে’। রুশ বার্তা সংস্থা তাসের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছিল, ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ায় হামলা হলে ইউক্রেনের ভেতরে এবং প্রয়োজনে তার বাইরেও ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানতে পারে মস্কো।
সেই হুঁশিয়ারির কয়েক দিনের মাথায় এবার সরাসরি পুতিনের মুখে ‘সামরিক গোপন কথা’। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রুশ প্রেসিডেন্ট 'ব্রিটেনে হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বা হামলা চালানো হবে' এমন কোনো ঘোষণা দেননি। সম্ভাব্য হামলা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে গেছেন রহস্যময় ওই মন্তব্যে। ফলে তার বক্তব্যকে সরাসরি হামলার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
একই সংবাদ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কথা বলেছেন পুতিন। স্কাই নিউজ জানিয়েছে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ভেতরে বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে দাবি করে পুতিন বলেন, শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ ভেঙে পড়বে। কীভাবে সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার ব্যাখ্যা অবশ্য দেননি তিনি।
অন্যদিকে ব্রিটেন পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। কিয়েভ সফরে প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম বলেছিলেন, ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনের পাশে থাকবে তার দেশ। ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি, ইউক্রেনকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের বেশি সময় পর তাই লড়াইয়ের উত্তাপ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ইউক্রেনকে আরও শক্তিশালী দূরপাল্লার অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা দিচ্ছে লন্ডন, অন্যদিকে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনার প্রসঙ্গে হুঁশিয়ারির ভাষা ক্রমেই চড়া করছে মস্কো। তার মধ্যেই পুতিনের দু’টি শব্দ নতুন প্রশ্ন রেখে গেল, ‘সামরিক গোপন কথা’র আড়ালে ঠিক কী পরিকল্পনা করছে রাশিয়া?