চীন-নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন জনপদ এখন বন্যায় বিধ্বস্ত। নেপালের খবর সঙ্গে সঙ্গে জানা গেলেও তিব্বতের পরিস্থিতি সেভাবে জানা যায়নি।কারণ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অনেক ভিডিও মুছে ফেলা হয়েছিল। সেইসব ভিডিও সরিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম সরকারের প্রচারণামূলক বিষয়বস্তুতে ভরিয়ে দেয়া হয়েছিল।
ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের যাবতীয় দৃশ্যমান প্রমাণাদি মুছে ফেলার সেই প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।
ফলে বেঁচে যাওয়া মানুষরা সেদিন ভয়াবহ বন্যার ভিডিও আপলোড করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু চীন সরকারের তথ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যত নিষ্ফল হয় সেই চেষ্টা। জনমতকে নিজেদের অনুকূলে নিতে এবং দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতির অস্বস্তিকর সত্য ধামাচাপা দিতে অত্যন্ত সুনিপুণ ও নিখুঁত কৌশল অবলম্বন করে সরকার।
• যেভাবে ন্যাশনাল গেট তলিয়ে যাওয়ার ভিডিও উধাও
বন্যাজনিত ভূমিধসের পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা চীন ও নেপালের মাঝের স্থলপথে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র গিরং পোর্ট-এর প্রবল স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধারণ করেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ভিডিওটিতে দেখা যায়, পানি ও ধ্বংসস্তূপের কালো দেয়াল-সদৃশ বিশাল এক স্রোত গুঁড়িয়ে দিচ্ছে সীমান্তের ন্যাশনাল গেট।
চীনের জনপ্রিয় অ্যাপ উইচ্যাটে ‘গিরং পোর্টে ধেয়ে এলো আনসেন্সর্ড ভূমিধস’ শিরোনামের এক নিবন্ধে স্থানীয় ব্লগার মাতৌ ছিংনিয়েন ভয়াবহ সেই দৃশ্য তুলে ধরেন। ছিংনিয়েন বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তটি গিরং পোর্টে ঘটেছিল।
সেখানে তিনি বলেন, আতঙ্কিত মানুষেরা (যার মধ্যে শিশুরাও ছিল) তখন প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করছিল। কিন্তু তাদের ছুটে প্রাণরক্ষার চেষ্টার সেই ভিডিও হঠাৎ শেষ হয়ে যায় কুচকুচে কালো এক স্রোতধারা এসে ক্যামেরার দৃশ্যপট গ্রাস করে নেয়ায়।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চীনের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সেই নিবন্ধ এবং মূল ভিডিও ফুটেজ উধাও হয়ে যায়।
চায়না ডিজিটাল টাইমসের (সিডিটি) তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের ওই গেট ধসে পড়ার ভিডিওটি উইচ্যাটে শেয়ার করা, এমনকি ব্যক্তিগত মেসেজে আদান-প্রদান করাও সেদিন আটকে দেওয়া হয়েছিল।
সংবেদনশীল কী-ওয়ার্ড ও মিডিয়া পর্যবেক্ষণ বিশেষজ্ঞ, সিডিটি-র সম্পাদক মিরা মনে করেন, এমন সেন্সরশিপের মূল কারণ, ‘জাতীয় গেট’ নামের প্রতীক, কেননা, ভিডিও ফুটেজটিতে কোনো বীভৎস সহিংসতা, বিক্ষোভ কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না।
ডিজিটাল বিশ্লেষকদের মতে, এই সেন্সরশিপ চীনের ইন্টারনেট নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিকে তুলে ধরে। এখন কেবল টেক্সট-ভিত্তিক কী-ওয়ার্ড ফিল্টার না করে প্ল্যাটফর্মগুলো নির্দিষ্ট দৃশ্য শনাক্ত করতে ভিডিও ফিঙ্গারপ্রিন্টিং, ইমেজ হ্যাশিং এবং মেশিন-লার্নিং মডেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে।
তাই এখন কোনো দৃশ্যমান বিষয়বস্তু বা ভিডিও একবার ব্লকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হলে, তা অনলাইনে প্রকাশের আগেই আটকে দেওয়া হয়।
• ঢাল যখন পরিতৃপ্তি
গিরং বন্দরের খবর চেপে যাওয়ার বিষয়টি বেইজিংয়ের কৌশলে এক ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাতে দেখা যায়, গণহারে তথ্য মুছে না ফেলে এখন প্রেসিসন সার্জারি, অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট অস্ত্রোপচার এবং নির্দিষ্ট বয়ানের বন্যায় তথ্য-পরিবেশকে আচ্ছন্ন করার কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে।
চীনের জনপ্রিয় লাইফস্টাইল ও সার্চ প্ল্যাটফর্ম শিয়াওহংশু-তে তিব্বত মাডস্লাইড লিখে সার্চ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবে সার্চ দিলে ফলাফল হিসেবে কোনো ফাঁকা পৃষ্ঠা দেখানো হয় না, তার বদলে, প্ল্যাটফর্মটির অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের সামনে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি এবং সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া-র বাছাই করা কিছু প্রতিবেদন চলে আসে।
সেখানে বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পায় ঘটনার আগের ও পরের তুলনামূলক চিত্র, অনেক উঁচুতে হিমবাহ ধসে পড়ার (যা বিপর্যয়ের সরকারি বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত) মানচিত্র এবং রাষ্ট্রীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত ড্রোন ফুটেজের মতো হাই-রেজোলিউশনের আবেগহীন গ্রাফিক্স। সীমান্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা সেই ভিডিওগুলোর কোনো অস্তিত্বই সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিপুল পরিমাণ নিরাপদ ও দৃষ্টিনন্দন সরকারি বিষয়বস্তু দিয়ে ডিজিটাল জগৎ পূর্ণ করে রাষ্ট্র একদিকে যেমন জনগণের তাৎক্ষণিক কৌতূহল মেটায়, তেমনি স্বাধীন সাংবাদিকতা বা স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনাকেও শুরুতেই স্তব্ধ করে দেয়।
চীনের মাইক্রোব্লগিং জায়ান্ট ওয়েইবো-তেও ঘটনার বয়ান একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ২৬ আগস্ট তিব্বত মাডস্লাইড অল্প সময়ের জন্য ট্রেন্ডিং তালিকায় থাকলেও, পরেরদিন সকালে হতাহতের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, বলা হয় মোট ৩ জন নিহত এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ।
সংবাদমাধ্যমে প্রাধান্য পায় দুটি বহুল প্রচারিত ও বিস্তারিত সরকারি প্রতিবেদন, এক, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরো বৈঠক আহ্বান, দুই, প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের গিরংয়ে গিয়ে সরাসরি উদ্ধারকাজ তদারকি করা। ডিডাব্লিউ।