Image description

চীনের প্রভাব এখন আর শুধু বাণিজ্য, ঋণ, অবকাঠামো বা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) সীমাবদ্ধ নেই। চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কিছু দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলে এমন ধারণা তৈরি করছে যে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পশ্চিমা ধরনের ঘনঘন নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তনের চেয়ে শক্তিশালী ও ধারাবাহিক সরকার বেশি কার্যকর হতে পারে। 

রাজনৈতিকখবর আপডেট

 

সাউথ এশিয়া মনিটরে ২৬ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘বেইজিংস সাবটল পাওয়ার প্লে ইন সাউথ এশিয়া: ইজ চায়নাজ গভর্ন্যান্স মডেল ইনফ্লুয়েন্সিং ডেমোক্র্যাটিক নেশনস?’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব মন্তব্য করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ–ট্রিনকোমালি -এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শ্রীলঙ্কান ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এ. জাথিন্দ্রা।

বিজ্ঞাপন

চীন কি শুধু অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, নাকি তার রাষ্ট্রপরিচালনার মডেলও ছোট গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে লেখাটিতে। 

ভৌগোলিকম্যাপ ও গাইড অন্বেষণ করা

 

চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য থেকে রাজনৈতিক মডেলের প্রতি আকর্ষণ

চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে তার দারিদ্র্য থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার অভিজ্ঞতা আকর্ষণীয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রশংসা ধীরে ধীরে তার একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপরিচালনার মডেলের প্রশংসায় পরিণত হয়।

শ্রীলঙ্কায় গণতন্ত্র বনাম দীর্ঘমেয়াদি সরকার নিয়ে বিতর্ক

শ্রীলঙ্কা সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের সময় চীনের কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে শিক্ষা নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার ব্যবসায়ী মহলেও প্রশ্ন উঠেছে—প্রতি পাঁচ বছর পরপর প্রেসিডেন্ট ও সংসদ পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা কীভাবে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব?

শ্রীলঙ্কা–কোরিয়া বিজনেস কাউন্সিলের একটি আলোচনায় ব্যবসায়ী নেত্রী অরোশি নানায়াক্কারাও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। দীর্ঘমেয়াদি সরকার ছাড়া সমাজের বড় ধরনের পরিবর্তন করা কঠিন বলে মত দিয়েছেন জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)-এর সাধারণ সম্পাদক টিলভিন সিলভা। অর্থাৎ চীনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রভাব হচ্ছে—চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সরাসরি রপ্তানি না করেও তার উন্নয়ন মডেলকে আকর্ষণীয় করে তোলা।

স্নায়ুযুদ্ধের সোভিয়েত মডেলের সঙ্গে পার্থক্য

স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি একটি কমিউনিস্ট মতাদর্শ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। চীনের পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সূক্ষ্ম। চীন গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলে না যে তাদের কমিউনিস্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বরং অর্থনৈতিক সাফল্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজের মডেলকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে। এটি চীনের নীরব কৌশল।

‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ নীতির প্রশ্ন

চীন আনুষ্ঠানিকভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি প্রচার করলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সবসময় একই রকম নয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নেপাল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর টিবেটান স্টাডিজ-এর সহযোগিতায় একটি টিবেটান স্টাডিজ কনফারেন্স হওয়ার কথা ছিল। চীনা উদ্বেগের পর নেপালি কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুষ্ঠানটি না করার নির্দেশ দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজক হিসেবে সরে যায়। সম্মেলনে ৩৯টি দেশের ৭০০-এর বেশি গবেষক অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তিব্বত ইস্যুতে চীনের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নেপালের নিজস্ব একাডেমিক সিদ্ধান্তের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

নেপালে তিব্বতি ইস্যু 

রাজনৈতিকখবর আপডেট

 

নেপালের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ দেশটিতে তিব্বতি শরণার্থী জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে নেপাল তিব্বত থেকে ভারতে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট ছিল। নেপাল তিব্বতি শরণার্থীদের দালাই লামার জন্মদিন উদ্‌যাপনের অনুমতি দিলেও তিব্বতি জাতীয় সংগীত, মিছিল, স্লোগান এবং নির্বাসিত তিব্বতি প্রশাসনের বক্তব্য নিষিদ্ধ করেছে। এটি চীনের চাপ ও নেপালের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যকার সম্পর্কের উদাহরণ।

শ্রীলঙ্কাতেও চীনের প্রভাব?

দালাই লামার ক্যান্ডির টেম্পল অভ দ্য টুথ এবং অনুরাধাপুরার মহাবোধি ট্রি-তে ধর্মীয় উপাসনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল শ্রীলঙ্কা, কারণ এতে চীনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল। যদি একটি দেশ নিজের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্য একটি শক্তিশালী দেশের প্রতিক্রিয়াকে এত গুরুত্ব দেয়, তাহলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে নন-ইন্টারফিয়ারেন্স বলা যায় কি না?

চীনের নীতিতে ‘দ্বৈততা’ 

 

চীন নিজের স্বার্থের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আবার অন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন তার কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সেটির প্রতি ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে। বেইজিংস স্ট্র্যাটেজিক ডুয়ালিটি প্রসঙ্গে চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অভ হংকং-এর একটি একাডেমিক সহযোগিতা প্রকল্পের উদাহরণ দেয়া যায়। যেখানে শ্রীলঙ্কার একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা পর্যালোচনা করার কথা বলা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর সামনে দ্বিধা

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সামনে একদিকে রয়েছে— চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা → অবকাঠামো → বিনিয়োগ → উন্নয়ন। অন্যদিকে রয়েছে— চীনের রাজনৈতিক প্রভাব → নীতিগত চাপ → সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্ভাব্য ক্ষয়। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে উন্নয়নের সুযোগ পাওয়া গেলেও, সেই সম্পর্ক যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কোনো সমস্যা নয়। বিষয় হলো ‘ইকোনমিক এনগেজমেন্ট উইদাউট পলিটিক্যাল ডিপেন্ডেন্সি’—অর্থনৈতিক সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় থাকবে। কিন্তু চীন দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ঋণ নিয়ে আসছে না; তার উন্নয়ন মডেলও একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে উপস্থিত হচ্ছে। চীনের সাফল্য দেখে যদি দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশগুলো মনে করতে শুরু করে যে- দ্রুত উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী সরকার বেশি প্রয়োজন, তাহলে সেটিই হতে পারে বেইজিংয়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক প্রভাব।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর