Image description

ইসলাম ধর্ম, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনল সৌদি আরব। যার ধারাবাহিকতায় স্কুলের বই (একাদশ শ্রেণি) থেকে বাদ পড়েছে একটি ছোট; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বাক্য। আর সেটি হলো, ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’। নতুন এ  পরিবর্তনের মাধ্যমে  মুছে গেল দেশটির স্কুল পাঠ্যক্রমে লালিত পাঁচ দশকের বেশি সময়ের ‘মুসলিম আদর্শ’। তবে পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইমপ্যাক্ট-সে’।

ইসরায়েল খুশি হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সৌদি আরবের পাঠ্যবই থেকে বাক্যটির অপসারণ শুধু শিক্ষাক্রমের পরিমার্জন নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতির এক দূরদর্শী সংকেত। রিয়াদের শ্রেণিকক্ষ থেকে ‘ইহুদিবাদী শত্রু’র মতো চিরন্তন আবেগ ও সংঘাতের বয়ান মুছে ফেলার এই কৌশল মূলত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের এক মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর আলোকেই এ মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর।

গত জুলাইয়ের শেষ দিকে সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ের ওপর একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা। সেখানেই উঠে আসে এসব কথা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাদ দেওয়া বাক্যটি শুনলে মনে হতো, জেরুজালেমের ওপর মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ বা উপস্থিতি হুমকির মুখে রয়েছে। কিংবা জেরুজালেম হয়তো এমন একটি জায়গা, যেখানে মুসলমানদের সঙ্গে অন্যান্য গোষ্ঠী বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে হয়তো বিবাদ বা প্রতিযোগিতা চলছে।’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, এমন একসময় এই সমালোচনা প্রকাশ হলো, যখন ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরা ক্রমাগত আল-আকসা মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে একটি ইহুদি উপাসনালয় নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন। অথচ মসজিদটি মুসলমানের কাছে তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। সবশেষ গত সোমবার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের ভেতরে ইহুদি সেটেলারদের প্রার্থনার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছে। যাকে কয়েক দশক ধরে চলে আসা স্থিতাবস্থাকে নষ্ট করার উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইসরায়েল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ওই সেটেলাররা ফিলিস্তিন ভূমিতে শুরু করেছে বসতি তৈরির কাজও।

বাদ পড়ল হাদিসওশুধু ওই একটি বাক্যই নয়, সৌদি আরবের পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়েছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিসও। যেখানে অসুস্থ এক ইহুদি বালককে দেখতে যাওয়া এবং পরে সেই বালকের ইসলাম গ্রহণের ঘটনার বর্ণনা ছিল। এ পরিবর্তনকেও ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে ইমপ্যাক্ট-সে।

২০২৫ সালের সংস্করণে বাদ পড়া হাদিসটির প্রসঙ্গ টেনে সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এ উদাহরণটি বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি গ্রহণযোগ্যতা দেখানো হয়েছে। কেননা ওই উদাহরণে শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছিল, ইসলামের প্রতি অবিশ্বাসের পরিণতি নরকবাস, যা তাদের আর শিখতে হবে না।’

ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস এবং পাপ বা ধর্মে বর্ণিত গুনাহসম্পর্কিত কোরআনের কিছু আয়াত সংকুচিত করাকেও স্বাগত জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে শুধু ইসলামই মানবতার স্বাভাবিক ধর্ম, মুসলিম শিক্ষার্থীদের এ শিক্ষা দেওয়ার সমালোচনাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

ইমপ্যাক্ট-সে বলছে, এর আগে বেশ কয়েকটি মানচিত্রে চিহ্নিত ছিল না ইসরায়েল। বরং পুরো অঞ্চলকে ফিলিস্তিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিন চিহ্নিত লেখাটি সরিয়ে দিয়েছে। তবে মানচিত্রে এখনো ইসরায়েলকে চিহ্নিত করা হয়নি। এ ছাড়া একাদশ শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে ‘জায়নবাদী শত্রু’ শব্দটির বদলে ‘ইসরায়েলি দখলদার’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হলেও এই পরিবর্তন যথেষ্ট মনে করে না সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিভাষার পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েলের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব কিছুটা কমেছে। তারপরও ইসরায়েলি দখলদার—শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি আছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে— মত তাদের। সৌদি পাঠ্যবইয়ে জায়নবাদীদের ‘ধূর্ত ও প্রতারক’ হিসেবে চিহ্নিত করারও বিরোধিতা করেছে ইমপ্যাক্ট-সে।

প্রতিবেদনে ফিলিস্তিন এবং আরব পাঠ্যবইগুলোয় ইসরায়েলকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও উঠে এসেছে। যদিও এই সংস্থা বা এর প্রতিষ্ঠাতা কাউকেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে কোথাও স্বীকৃতি দিতে দেখা যায়নি। মিডল ইস্ট আইয়ের ওই প্রতিবেদনে অবশ্য এসব পরিবর্তনের বিষয়ে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য যুক্ত করা হয়নি। ফলে কোন প্রেক্ষাপটে বা কোন ভাবনা থেকে এসব পরিবর্তন এসেছে, সে সম্পর্কে জানা যায়নি। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকেই দেশটির জাতীয় পাঠ্যক্রমে জেরুজালেমের প্রতি মুসলিমদের ধর্মীয় দাবির পক্ষে নানা বক্তব্য, হাদিস ও অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত হয়।