পাঁচ বছর, ১০ বছর বা তারও আগে চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। ৭০, ৭৫ বা তারও বেশি বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথচ ঘুরে-ফিরে আবারও কাজের চেয়ারে বসতে মরিয়া ওইসব কর্মকর্তা। বিশেষ করে প্রশাসনের ‘বয়স্ক কর্মকর্তা’খ্যাত ’৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা চুক্তিতে নিয়োগ পেতে বেশি মরিয়া। এরই মধ্যে কেউ কেউ একবার চুক্তির মেয়াদ শেষে আবারও পুনর্নিয়োগ পেতে প্রভাবশালী বিশেষ করে প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সরকার ঘনিষ্ঠদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সফল হতে নিজেদের ত্যাগী ও এক সময়ের বঞ্চিত উল্লেখ করে ধরনা দিচ্ছেন। শুধু ’৮২ নয়, ’৮৪, ’৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদেরও সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাসায়-অফিসে দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত একটি বিশেষ ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতি ১০ শতাংশ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারেন। তাই দীর্ঘদিন থেকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি চলে আসছে। তবে এটি বন্ধ হলে প্রশাসনের কাজ আরও গতিশীল হবে বলে দাবি তাদের। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী প্রশাসনে চুক্তিতে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার যোগ্যদের মূল্যায়ন করতে চায়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতেই হবে বিষয়টি এমন নয়, প্রয়োজন হলে দেয়। আমাদের সরকার মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করতে চায়।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশাসন নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অকার্যকর প্রশাসন ছিল, এখন সব অফিসে ঠিকঠাকমতো কাজ চলছে। সরকারের সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার। যোগ্য লোকদের প্রশাসনে নিয়ে আসা হচ্ছে। সরকার আইন ও বিধান মেনে নিয়োগ দিচ্ছে। সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নতুন নয়। সব সময়ই কমবেশি হয় কিন্তু সম্প্রতি শীর্ষ প্রশাসনিক পদে এ ধরনের নিয়োগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে বিষয়টি প্রশাসনের ভিতরে-বাইরে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জনপ্রশাসনে মোট কর্মকর্তা ৬ হাজার ৬৯৭ জন। এর মধ্যে সচিব ও সমমর্যাদার পদে কর্মরত ৭৯ জন। এর মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত। অর্থাৎ কর্মরত সচিবদের ২৯ শতাংশের মতো চুক্তিভিত্তিক। পদোন্নতির প্রত্যাশায় থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে সচিব পদগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য ‘ব্লক’ হয়ে যাচ্ছে, ফলে যোগ্য অনেক কর্মকর্তার পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রশাসনে আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে যারা সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি পেতে চান, নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ওইসব ব্যাচের কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।
১৬ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণিও এক দিন বাদে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়। ১৭ তারিখেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ দুই পদে ফের তাদেরই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নিয়ে প্রশাসনের ভিতরে তোলপাড় চলছে। এর আগে গত কয়েকদিন ধরে তারা দুজন পুনরায় নিয়োগ পেতে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ব্যক্তি ও সরকার ঘনিষ্ঠদের বাসায় দৌড়ঝাঁপ করেন বলেও জানা যায়। সূত্র জানায়, ওই দুই কর্মকর্তাকে পুনরায় পদে রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে আদেশ বের করবেন এমন দায়িত্ব নিয়েছিল একাধিক ব্যক্তি। সরকারের একটি গোয়েন্দা সূত্র এবং সরকার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, জনপ্রশাসনের সাচিবিক কাজ অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। নাসিমূল গণি শারীরিকভাবে কিছুটা ফিট থাকলেও এহছানুল হক শারীরিকভাবেও আনফিট উল্লেখ করেছেন মন্ত্রণালয়েরই একাধিক কর্মকর্তা। গত সপ্তাহে একাধিক দিন মন্ত্রিপাড়ার কয়েকজনের বাসায় দেখা গেছে এহছানুল হককে। তার পুনর্নিয়োগে হতবাক হয়েছেন অনেকেই।
সরকারের অনন্ত পাঁচজন সচিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার ঘনিষ্ঠরা অনেক সময়ই প্রধানমন্ত্রীর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছান না। একটা ভাঙাচোরা প্রশাসন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে নিয়মিত ব্যাচ থেকে দায়িত্ব দেওয়া সবচেয়ে উত্তম। দায়িত্বশীল এক সচিব বলেন, যদি পুরোনোদেরই বারবার এভাবে চুক্তিতে আনা হয় তাতে প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের কাজের গতি নষ্ট হয়। দুই সচিবের পুনরায় চুক্তিতে নিয়োগে যারা অন্তর্বর্তী সময় থেকে অপেক্ষায় আছেন তাদের মাঝে প্রশাসন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। ’৮৫ ব্যাচের এক কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি-মনা কর্মকর্তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা (উপরোক্ত দুই সচিব) বঞ্চিত ছিলেন বলে সরকার একবার নিয়োগ দিয়েছে, আবার কেন-সে প্রশ্নও রাখেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয় চুক্তিতে সেটার যেন অপব্যবহার না হয়। কারও তদবির না শুনে সরকারের দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কতটা যোগ্য। তিনি আরও বলেন, সিভিল সার্ভিসে দুর্দিন চলছে। প্রশাসনে দীর্ঘদিনের দলাদলি, হিংসা-বিদ্বেষ, একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্কের কারণে সরকারও বিব্রত হচ্ছে। তাই দলীয় বিবেচনার বাইরে গিয়ে গ্রহণযোগ্য, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দিতে হবে।
নিয়মিত সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগের বাইরেও সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদাসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদেও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অতিরিক্ত সচিব বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রশাসনে বড় পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য আসায় আমার মনে হয় এটি ইশতেহারের পরিপন্থি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, চুক্তিতে নিয়োগ সরকারের ইচ্ছা। তবে এটি সবসমই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমি বলব, কোনো পদে চুক্তি পরিহার করে নিয়মিতদের মধ্যে সিনিয়র দেখে বর্তমান সরকারের মনোভাব সম্পন্ন কাউকে দেওয়া হোক। এটা সরকারের জন্যই মঙ্গলজনক।