Image description

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রত্যাশিত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বৈঠক করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ভোটের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, ইসি চলতি অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠান—ইউপি, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার কর্মপরিকল্পনা করছে। এই পাঁচ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রস্তাব সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়েছে। তবে প্রথম ভোট কোন স্থানীয় সরকারের হবে, এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট আয়োজনের প্রস্ততি চলছে। নির্বাচনের সময়সূচি নির্বাচন কমিশনই নির্ধারণ করবে।

নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ভোটে সম্ভাব্য ব্যয় হবে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের অনুমোদনের পর অর্থছাড়ের পরই ভোটের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।

শীতকালকে ভোটের জন্য উপযুক্ত সময় বিবেচনা করে ডিসেম্বর থেকে ভোটগ্রহণ শুরুর সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থাৎ ডিসেম্বরকে ভোটের সম্ভাব্য সূচনাকাল হিসেবে আলোচনা করা হলেও এখন পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত সময় বলা যাচ্ছে না।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের আগেভাগেই প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্প্রতি তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপিপ্রধান বলেন, নির্বাচনে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনার সুযোগ থাকবে না; জনগণের আস্থা অর্জন করে কাজের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রের বক্তব্য, ‘স্থানীয় সরকারের ভোটের বিয়ে প্রধানমন্ত্রী খুবই সিরিয়াস। যেকোনো মূল্যে আমাদের সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে হবে। এখানে ন্যূনতম কম্প্রোমাইজ করার সুযোগ নেই।’

স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। ইসির হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচন উপযোগী রয়েছে চার হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৬১টি জেলা পরিষদ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়া বাকি সব সিটিতেই প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার।

দ্রুতই সমন্বয় সেল গঠন : স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাঠের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে দ্রুতই সমন্বয় সেল গঠন করা হবে। এ লক্ষ্যে গতকাল দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে আইজিপি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সমন্বয় সেল গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে আজ (মঙ্গলবার) সিইসির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।’

এ বিষয়ে সিইসি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্রুতই সমন্বয় সেল গঠন হয়ে যাবে। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীসহ সব ধরনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী থাকবে। নির্বাচন কমিশন থেকেও প্রতিনিধি থাকবে। এর বাইরেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব ধরনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথমত ভোট হচ্ছে—সেটা দেখতে চাই। নির্বাচন কমিশনের যত প্রস্তুতিই থাকুক, সরকারের যদি সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে নির্বাচন হবে না।’

বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যারা জাতীয় নির্বাচনের জন্য একসময় প্রতিদিন দাবি জানিয়ে আসছিল, তারা যদি স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনটা প্রতীকবিহীন মানে নির্দলীয় হওয়া। নির্দলীয় মানে কেউ কোনো দলীয় প্রার্থী যাতে না দেয়। একক প্রার্থীর জন্য যেন তারা অপচেষ্টা না চালায়। নির্বাচন প্রকৃত অর্থে যেন নির্দলীয় হয়। সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন, বিভিন্নভাবে সমাজে তাঁদের জনপ্রিয়তা আছে, দলীয় নির্বাচন হলে তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে নিরুৎসাহ হন এবং এর জন্য প্রার্থী কমে যায়। আমরা ইতিবাচক দিক থেকে বলতে চাই, সত্যিকার অর্থে নির্দলীয় নির্বাচনটা হোক, যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে।’

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলেন, ২০১৫ সালের আগেও স্থানীয় নির্বাচন আইনত নির্দলীয় ছিল। কিন্তু সে সময়ও দলীয় সমর্থন এড়ানো যায়নি। এবারও জামায়াত ও এনসিপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে রেখেছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরেই স্থানীয় সরকার বিভাগের পাঁচটি নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। এ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রস্তুতি শেষ হলে কোন নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।’

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাজেট অর্থ বিভাগ থেকে ছাড় পেলেই কবে নাগাদ নির্বাচন শুরু হতে পারে তা চূড়ান্ত করা হবে। সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে চায়। সরকারের পরামর্শেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করবে।

তিনি আরো জানান, এবার চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে ভোট হবে দলীয় প্রতীক ছাড়া। দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা আছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এখানে দলীয় কোনো প্রভাব কাজে আসবে না।

কোন নির্বাচনে কত ব্যয় হতে পারে : জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদে প্রায় দুই হাজার ৯০০ কোটি, উপজেলা পরিষদে প্রায় দুই হাজার কোটি, সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩৩০ কোটি এবং পৌরসভায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। নির্বাচন কমিশন এমন চাহিদার কথায় জানিয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যয় যুক্ত হলে মোট ব্যয় ছয় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা এসেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছাড়াও কমিশনের অন্যান্য নির্বাচনী ও প্রশাসনিক ব্যয় এর মধ্যে রয়েছে।