টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য কারণে দেশের গ্রামীণ সড়কগুলো বেহাল। দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোথাও পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ।
ভাঙাচোরা সড়কের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী ও গর্ভবতী নারীরা। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামীণ জনপদের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সড়কগুলোর নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় দেশের বিপুল গ্রামীণ সড়ক বছরজুড়ে চলাচলের উপযোগী রাখতে দুই হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকার পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় মোট ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। সরকারি অর্থায়নে জুলাই ২০২৬ থেকে সাড়ে তিন বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
কয়েক দশক পর বড় পরিসরে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ : এলজিইডির কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে, পরবর্তী সময়ে ২০০৩ থেকে ২০০৭ মেয়াদে এলজিইডির অধীনে সড়কগুলোতে ব্যাপক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল। এরপর বড় পরিসরে আর এ ধরনের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
বর্তমানে এলজিইডির অধীনে প্রায় চার লাখ ১১ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ পাকা।
বিশেষ করে বৃষ্টির সময় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকের ধান-চাল, সবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে একদিকে কৃষকের পরিবহন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে।
এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে বছরজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষি ও অকৃষিজাত পণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে। নারীর কর্মসংস্থানও বাড়বে।’
কর্মসংস্থান হবে ৪৫ হাজারের বেশি নারীর
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এর আওতায় ৪৫ হাজার ৭৮০ জন দুস্থ নারীকে সরাসরি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত করা হবে।
প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. হানিফ কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রামীণ সড়কগুলোকে চলাচলের উপযোগী রাখার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। এর ফলে একই সংখ্যক পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় প্রতি ইউনিয়নে ১০ জন করে নারী শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁদের দৈনিক মজুরি হবে ৩০০ টাকা। কাজের বিনিময়ে তাঁরা নিয়মিত মজুরি পাবেন এবং এর একটি অংশ সঞ্চয় হিসেবে জমা থাকবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সঞ্চিত অর্থ এককালীন দেওয়া হবে। এই অর্থ কাজে লাগিয়ে তাঁরা পরবর্তী সময়ে ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।’
বছরে ব্যয় হবে ৫২০ কোটি টাকার বেশি
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫২২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৫১৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৫১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৫২০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে
আগের কয়েকটি রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা ও সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এলজিইডির কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮৩ সালে কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিডা) সহায়তায় কেয়ার বাংলাদেশের মাধ্যমে দেশের সাতটি ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় কর্মসূচিটির পরিধি দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। পর্যায়ক্রমে রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম বা আরইআরএমপির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন করা হয়। সর্বশেষ পর্যায়টি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করে এলজিইডি।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, অতীতে বাস্তবায়িত আরইআরএমপি প্রকল্পগুলোর সাফল্যই নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্য সুফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কিভাবে অব্যাহত থাকবে, সে বিষয়ে একটি ‘এক্সিট প্ল্যান’ রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে কাজের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেটিও নিশ্চিত করার শর্ত রয়েছে।