Image description

 জাতিসংঘ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে ওয়াশিংটনে নতুন করে তৎপরতা দেখা দিয়েছে।। ইসরায়েলভিত্তিক একটি ডানপন্থী গবেষণা প্রতিষ্ঠান লবিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে এ ধারণা তুলে ধরতে। কংগ্রেস থেকে শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের কাছে জাতিসংঘবিরোধী অবস্থানের পক্ষে যুক্তি পৌঁছে দেওয়া এর লক্ষ্য।

এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে মিসগাভ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড জায়নিস্ট স্ট্র্যাটেজি। প্রতিষ্ঠানটির একটি প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো সংস্কার করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা কঠিন। বরং ওয়াশিংটনের উচিত নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলা।

প্রতিবেদনটির সহলেখকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ইসরায়েলি জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরদান এবং মিসগাভের নির্বাহী পরিচালক আশের ফ্রেডম্যান।

লবিং কার্যক্রমের জন্য মিসগাভ ওয়াশিংটনের একটি লবিং প্রতিষ্ঠানকে প্রায় এক মাসের জন্য নিয়োগ করে। চুক্তির মূল্য ছিল ৫ হাজার ডলার।

অর্থের পরিমাণ ছোট হলেও লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের সদস্যদের কাছে গবেষণা প্রতিবেদন পৌঁছে দেওয়া, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি এবং প্রতিবেদনের লেখকদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের বৈঠকের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা ছিল।

শুধু কংগ্রেস নয়, প্রচারণার আওতায় রাখার পরিকল্পনা ছিল জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও বাজেট-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরকেও।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, জাতিসংঘে মার্কিন মিশন এবং হোয়াইট হাউসের বাজেট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও বার্তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়।

মিসগাভের প্রতিনিধিদের ওয়াশিংটন সফরের মাধ্যমে আইনপ্রণেতা, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও বিভিন্ন নীতিবিশেষজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পরিকল্পনাও ছিল।

জাতিসংঘ নিয়ে কেন এত ক্ষোভ?

মিসগাভের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, দ্বৈত মানদণ্ড এবং ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা UNRWA-কেও প্রতিবেদনে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির মূল বক্তব্য—জাতিসংঘকে শুধু সংস্কার করার চেষ্টা যথেষ্ট নয়; যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজেদের বৈশ্বিক স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরির দিকে এগোনো।

ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে মিল কোথায়?

এই লবিংয়ের ঘটনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনা করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেস্কো, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে মার্কিন অর্থায়ন ও অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ফলে ইসরায়েলি থিংকট্যাংকের এই প্রচেষ্টা ওয়াশিংটনের বর্তমান আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

ছোট চুক্তি, বড় বার্তা


লবিং চুক্তির অর্থমূল্য মাত্র কয়েক হাজার ডলার হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়ে নয়—প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভবিষ্যতে কোন পথে যাবে।

জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে। যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির অন্যতম প্রধান অর্থদাতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একটি। ফলে ওয়াশিংটন যদি সত্যিই জাতিসংঘ থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার পথে হাঁটে, তার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা, নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের ওপর।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ওয়াশিংটনে এই লবিং কি কেবল একটি ইসরায়েলি থিংকট্যাংকের প্রচারণা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বদলে যাওয়া বৈদেশিক নীতির আরও বড় কোনো পরিকল্পনার অংশ?