যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব বাহ্যিকভাবে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখালেও পর্দার আড়ালে কৌশল নিয়ন্ত্রণের এক বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ লড়াই শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঠিক কতখানি ব্যবহার করবে, তা নিয়েই মূলত এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
এই টানাপোড়েনের সর্বশেষ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সোমবার। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ বাঘের খারাজি জানান, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যদি আবারও পদত্যাগের হুমকি দেন, তবে তা গ্রহণ করবেন বলে খামেনি তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)-এর বরাতে রিপোর্টটি এলেও ইরান সরকার এটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেনি। খারাজি দাবি করেন, পেজেশকিয়ান বারবার পদত্যাগের হুমকি দিচ্ছেন, যদিও গত মে মাসে তার আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের খবর ইরানি কর্মকর্তারা অস্বীকার করেছিলেন।
আইএসডব্লিউ’র রিপোর্ট অনুযায়ী, সাবেক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ পেজেশকিয়ান যেন পদত্যাগের হুমকি দিয়ে সরকারের নীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে জন্যই মোজতবা এমন সতর্কতা দিয়ে থাকতে পারেন।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর বাস্তববাদী শিবিরের প্রতিনিধি পেজেশকিয়ান আমেরিকানপন্থি কিংবা লিবারেল সংস্কারক নন। তিনি এবং তার মিত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামরিক চাপকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে দরকষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান। অন্যদিকে, চরম কট্টরপন্থিরা আলোচনার তীব্র বিরোধী এবং তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে সমঝোতাহীন সংঘাতের পক্ষে।
এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। তবে বাস্তববাদী গোষ্ঠীর আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ রাখা কিংবা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে তা চীনের মতো অবশিষ্ট অর্থনৈতিক মিত্রদের দূরে ঠেলে দেবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ইরানের নিজস্ব তেল রফতানি ও আমদানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফও সম্প্রতি এমন ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
মোজতবার এই সতর্কতার খবর যদি সত্যি হয়, তবে তা ইরানের যুদ্ধকালীন রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ রূপ উন্মোচন করে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মুখে পেজেশকিয়ানের রাজনৈতিক চালের অন্যতম বড় অস্ত্র ‘পদত্যাগের হুমকি’ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাই হয়তো করছেন মোজতবা খামেনি। তবে খারাজি সরাসরি মোজতবা খামেনির প্রতিনিধিত্ব না করায় এই মন্তব্য অভ্যন্তরীণ বার্তার ইঙ্গিত দিলেও সর্বোচ্চ নেতা নিজে এটি বলেছেন কিনা, সেটির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ মেলেনি।
সূত্র: গালফ নিউজ