Image description

প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিবাহ আইন সংস্কারের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাজ্য। প্রস্তাবিত নতুন আইন পাস হলে, কোনও পৃথক সিভিল রেজিস্ট্রি ছাড়াই ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক নিকাহ সরাসরি পূর্ণ আইনি বৈধতা পেতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে সরকারের এই উদ্যোগকে এক ঐতিহাসিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগীয় মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা নিয়ে সরকারি পরামর্শ প্রক্রিয়া চলছে, যা ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই নতুন কাঠামোর অধীনে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিয়ের আইনি স্বীকৃতির বিষয়টি কেবল কোনও নির্দিষ্ট ভবনের (রেজিস্ট্রি অফিস বা অনুমোদিত উপাসনালয়) ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ভর করবে সরকারের নিবন্ধিত কাজী বা অফিসিয়েন্ট-এর ওপর।

ফলে মুসলিমদের ধর্মীয় বিবাহে ইজাব ও কবুলের মতো প্রক্রিয়াগুলোই সিভিল আইনে বৈধ সম্মতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে এর জন্য বিয়ের আগেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আইনি নোটিশ প্রদান ও আইনানুযায়ী নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হবে।

 

 

পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিম দম্পতিদের মধ্যে চারজনের মধ্যে প্রায় একজন কেবল ঐতিহ্যবাহী নিকাহ পরিচালনা করেছেন, যা যুক্তরাজ্যের সিভিল আইনে কোনও বৈধতা পায়নি। এমনকি আলোচিত ‘আখতার বনাম খান’ মামলায় কোর্ট অব আপিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ধরনের অনিবন্ধিত নিকাহকে আইনে ‘নন-কোয়ালিফাইং সেরিমনি’ (আইনগতভাবে অকার্যকর অনুষ্ঠান) হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে দাম্পত্য কলহ বা বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ (বিশেষ করে নারীরা) খোরপোশ, সম্পত্তি ও আর্থিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক পরিবারও এই আইনি জটিলতার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

 

প্রস্তাবিত এই আইন সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও আইনি বিশেষজ্ঞরা। আইন সংস্কারের প্রভাব তুলে ধরে ইসলামিক আইনি গবেষক শায়খ মোহাম্মদ আহমেদ বলেন, কয়েক দশক ধরে বিশেষ করে মুসলিম নারীরা এক ধরনের আইনি অস্পষ্টতার শিকার হয়েছেন। তারা ধর্মীয় অনুভূতি ও পবিত্রতা রক্ষা করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও সিভিল আইনে কোনও আর্থিক সুরক্ষা পাননি। নিকাহকে জাতীয় আইনি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হলে একদিকে যেমন ধর্মীয় নিয়ম অক্ষুণ্ণ থাকবে, অন্যদিকে ব্রিটিশ মুসলিম পরিবারগুলোর আইনি অধিকারও নিশ্চিত হবে।

 

 

নতুন আইনের অধীনে নিবন্ধিত কাজী বা অফিসিয়েন্টদের কেবল বিয়ে পড়ানোর অধিকারই থাকবে না; তাদের ওপর বেশ কিছু সতর্কতামূলক দায়িত্বও অর্পিত হবে। বিয়ের আগে বর ও কনের স্বাধীন সম্মতি যাচাই করা, আইনি বয়স পরীক্ষা করা এবং কোনও জোরপূর্বক বিয়ে বা ভুয়া বিয়ের সন্দেহ থাকলে তা কর্তৃপক্ষকে জানানো তাদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হবে।

 

পরামর্শ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগীয় মন্ত্রণালয় প্রাপ্ত মতামত বিশ্লেষণ করে পার্লামেন্টে একটি সমন্বিত ম্যারেজ বিল পেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিল পাস হলে ব্রিটিশ মুসলিম সমাজসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আর দুবার করে (একবার ধর্মীয় ও অন্যবার সিভিল) বিয়ে করার বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে না।