মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এতে অন্তত ২০ জন নিহতের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যেসব ‘ইরানপন্থী সন্ত্রাসীকে’ মার্কিন বাহিনী ও সৌদির জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার নির্দেশ দিয়েছিল, তাদের লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াপ্রধান ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির হামলায় তাদের ঘাঁটিতে অন্তত ২০ সদস্য নিহত হয়েছেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই সেন্টকম জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরান ‘আকস্মিক হামলার চেষ্টা’ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্য দিয়ে সংঘাতের সাময়িক বিরতি শেষ হয়।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে ওই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সব ক্ষেপণাস্ত্রই ‘সফলভাবে প্রতিহত’ করা হয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, ‘আমেরিকান শিশু হত্যাকারী বাহিনীর আগ্রাসনের জবাবে’ জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি ও একটি কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য, জাহাজগুলো ‘সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে’ গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় জলপথের ‘অনিরাপদ ও অবৈধ পথে’ চলাচল করছিল।
সেন্টকম জানিয়েছে, গত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসির নির্দেশনায় ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির যুদ্ধবিমান ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ‘একাধিক সন্ত্রাসী রসদ ও অস্ত্রের স্থাপনায়’ হামলা চালিয়েছে। এসব ড্রোন হামলাকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে সেন্টকম বলেছে, সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আইআরজিসি ও তাদের সন্ত্রাসী মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে এসব হামলা বন্ধ করতে হবে, নইলে যুক্তরাষ্ট্র আরও সামরিক পদক্ষেপ নেবে।’
বুধবার সকালে পিএমএফ জানিয়েছে, ইরাকে তাদের কয়েকটি ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির হামলায় অন্তত ২০ যোদ্ধা নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন। এই হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে তারা।
পিএমএফ মূলত শিয়া মুসলিম মিলিশিয়াদের একটি জোট, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। এর কয়েকটি গোষ্ঠী ইরানসমর্থিত এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের স্বার্থ এগিয়ে নিতে ব্যবহৃত প্রক্সি নেটওয়ার্কের অংশ।
ইরাকি ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা ও স্বার্থে এসব মিলিশিয়া একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। ইরাক থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিতে চাপ তৈরির লক্ষ্যেই এসব হামলা চালানো হয় বলে ধারণা করা হয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও নিয়মিত এসব গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা ‘বড় ধরনের ভুল হিসাব’।
এর আগে মঙ্গলবার সৌদি আরব জানিয়েছিল, দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন তারা প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেছেন, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইরাকি মিলিশিয়াগুলো এসব ড্রোন ছুড়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা তৃতীয় দিন কোনো হামলা না হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর নতুন করে সংঘাত শুরু হলো। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র টানা ১৩ রাত ইরানে বোমা হামলা চালায়। মার্কিন দাবি, এসব হামলায় দক্ষিণ ইরানের সুড়ঙ্গ ও সেতু ধ্বংস করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার ও এর নিয়ন্ত্রণ এখনো আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা। তেহরান অবশ্য এমন কোনো আলোচনা চলার কথাই অস্বীকার করেছে।
সংঘাত আরও বাড়লে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় বুধবার সকালে তেলের দাম বেড়েছে।