Image description

নক্ষত্র নয় ,  মধ্যপ্রাচ্যের রাতের আকাশে এখন ক্ষেণাস্ত্রের মেলা। হরমুজের শান্ত নীল ঢেউয়ে প্রতিশোধের লেলিহান শিখা।  রাত নামলেই ইরানের ঘুমন্ত জনপদে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মার্কিন যুদ্ধ দানব। পাল্টা হামলায় ইরানের  আগুন বৃষ্টিতে ঝলসে উঠছে কুয়েত থেকে বাহরাইন, জর্ডানের তপ্ত মরুভূমি থেকে সিরিয়ার আল-তানফ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সাম্রাজ্যের আকাশ।দিনে দিনে বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত । হামলার ষষ্ঠ দিনে (বৃহষাপতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল) ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় মারমুখি  আঘাত হেনেছে ইরান। ঘাত-প্রতিঘাতে কেঁপে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের শহর-বন্দর-লোকালয়।

যুক্তরাষ্ট্রের যত হামলা:

হরমোজগানবন্দর খামির সেতু

হরমোজগান প্রদেশের বন্দর খামির সেতুগুলোয় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় জনপদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ এগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকা ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সংযোগ ব্যবস্থা। সরবরাহ ও পরিবহনেও তৈরি হয়েছে ঝুঁকি।

বন্দর আব্বাসরেল অবকাঠামো

বন্দর আব্বাসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামোতেও আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র। দেশের প্রধান দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্রবন্দরকে অভ্যন্তরীণ পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে এই রেলপথ। পণ্য পরিবহন, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য এর গুরুত্ব অনেক।

ইরানশাহরবিমানবন্দর

সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের ইরানশাহর বিমানবন্দরও হামলার লক্ষ্য হয়। দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিমানবন্দর এটি। যাত্রী পরিবহন, জরুরি সেবা ও আঞ্চলিক যোগাযোগে রয়েছে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

চাবাহারসামুদ্রিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ রাডার

চাবাহারের সামুদ্রিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ রাডারেও আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত এই উপকূলীয় অঞ্চলে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ, উড়োজাহাজ চলাচল সমন্বয়, সামুদ্রিক নজরদারি ও বিমান নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে এই ব্যবস্থা।

সিরিক

হরমোজগানের উপকূলীয় এলাকা সিরিকও হামলার শিকার। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

কেশম দ্বীপ

হরমোজ প্রণালির সবচেয়ে বড় দ্বীপ কেশমও লক্ষ্যবস্তু হয়। সামুদ্রিক বাণিজ্য, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ।

আহভাজ

খুজেস্তান প্রদেশের শিল্পনগরী আহভাজেও চালানো হয় হামলা। তেল, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোর কারণে এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র।

বুশেহর

পারস্য উপসাগর তীরবর্তী বুশেহরও হামলার আওতায় আসে। জ্বালানি অবকাঠামো, সামুদ্রিক কার্যক্রম ও আঞ্চলিক সংযোগের জন্য শহরটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

ইরানের পাল্টাহামলা

বাহরাইন

পাল্টা জবাবে বাহরাইনের সাখির বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন হেলিকপ্টার ও গোয়েন্দা নজরদারি উড়োজাহাজে আঘাত হানার দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী।

কাতার

কাতারের দিকে একাধিক হামলা চালায় ইরান। কাতারি বাহিনী সেগুলো প্রতিহত করার দাবি করেছে। তবে ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশু আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কুয়েত

ড্রোন ব্যবহার করে কুয়েতে মার্কিন সেনা মোতায়েনের স্থান ও রসদ সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে হামলার দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, অস্ত্রগুদাম এবং দুটি হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় আঘাত হানার দাবি করেছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

সিরিয়া

সিরিয়ার আল-তানফ সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান বাহিনীর কমান্ড সেন্টারে হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে সিরিয়ায় এটি ইরানের প্রথম হামলা।

ওমান

ওমানের ঘানিম অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার ধ্বংসের দাবি করেছে আইআরজিসি। একই সঙ্গে ইরান-ওমান জলসীমার হরমুজ প্রণালিতে থাকা একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ রাডারেও হামলার দাবি করেছে বাহিনীটি।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর সীমান্তে আটকে নেই। হামলার পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে। কৌশলগত অবকাঠামো এখন সরাসরি যুদ্ধের লক্ষ্য। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। নতুন এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়।