চলমান যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম রাশিয়ার বুকে এযাবতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। কিয়েভের এই অতর্কিত ও বিধ্বংসী আঘাতে দাউদাউ করে জ্বলছে মস্কোর অন্যতম প্রধান একটি তেল শোধনাগার।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে কিয়েভের ঐতিহাসিক মঠ চত্বরে পুতিন বাহিনীর বর্বর হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতেই মস্কোকে এভাবে পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কিয়েভ।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই চরম মরণকামড়ে মস্কোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। প্রাণভয়ে রাশিয়ার বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তড়িঘড়ি করে সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ক্রেমলিন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে কিয়েভের একটি ঐতিহাসিক মঠ চত্বরে রাশিয়ার চালানো হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক ভয়েস মেসেজে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধ চাই না এবং কখনোই চাইনি। কিন্তু যদি ইউক্রেন পুড়ে যায়, তবে আপনাদের মস্কোও পুড়বে… আগ্রাসন বন্ধ করার সময় এসেছে, এই যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে।’
দূরপাল্লার এই ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ব্যাপকতা মস্কোর সাধারণ বাসিন্দাদের হতবাক করে দিয়েছে। কাপোটনো এলাকার এই গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই দৃশ্যত এই হামলা চালানো হয়। মস্কো শহরে সাধারণত বিমান হামলার আগাম সতর্কবার্তা (সাইরেন) বাজিয়ে বাসিন্দাদের সতর্ক করার চল নেই; ফলে আকস্মিক এই হামলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আতঙ্কিত বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিও ফুটেজে কাপোটনো শোধনাগার থেকে ধোঁয়ার তিনটি বিশাল কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি স্থাপনায় এটি ছিল দ্বিতীয় দফা হামলা। আক্রান্ত এই শোধনাগারটি মস্কোর অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল জ্বালানি কেন্দ্র। এটি রাশিয়ার এই রাজধানীতে ব্যবহৃত মোট পেট্রোলের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ডিজেলের প্রায় ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে।
রাশিয়া জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গত রাতে একাধিক অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ৫৫৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করেছে। প্রকৃতপক্ষে কতগুলো ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার মাঝেই কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ক্রেমলিন। এর অংশ হিসেবে মস্কো থেকে প্রায় ৪৩০ মাইল (৭০০ কিমি) পূর্বে অবস্থিত কাজান শহরে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংগঠনের (আসিয়ান) শীর্ষ নেতাদের আতিথেয়তা দিচ্ছে রাশিয়া।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির একটি বিশেষ বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। রাশিয়ার বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোই এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা।
এদিকে, ব্রাসেলসে পশ্চিমা মিত্রদের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মাঝেই কিয়েভের জন্য বড় ধরনের সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সচিব ড্যান জার্ভিস। তিনি জানান, যুক্তরাজ্য কিয়েভকে ইউক্রেনে তৈরি আরও দেড় লাখ ড্রোন এবং ৩৫০টিরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে ৭৫ কোটি পাউন্ড (৭৫০ মিলিয়ন পাউন্ড) আর্থিক সহায়তা দেবে।
যুক্তরাজ্যের দেওয়া এই বিশাল তহবিলের উৎস অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল।
সেই জব্দকৃত রুশ সম্পদ থেকে অর্জিত সুদের বিপরীতে নেওয়া ২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন পাউন্ডের একটি বিশেষ ঋণ থেকেই ইউক্রেনকে এই ৭৫ কোটি পাউন্ডের নতুন সামরিক সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটেন।