২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মুসলিম। প্রায় ৫ লাখ ৫ হাজার মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ৫ হাজার। এদের বেশির ভাগই সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালির মতো পশ্চিম আফ্রিকার দেশ থেকে আসা অভিবাসী। তারা মূলত সান্তিয়াগো দ্বীপের রাজধানী প্রাইয়া এবং সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিনদেলোসহ বিভিন্ন শহুরে এলাকায় বসবাস করেন।
সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণকারী এই মুসলিমরা ছোট ব্যবসা, খুচরা বাণিজ্য, সেবা ও নির্মাণ খাতের সঙ্গে যুক্ত থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
কেপ ভার্দেতে ইসলামের আগমন
১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা কেপ ভার্দেতে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে। আটলান্টিক দাস-বাণিজ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে যাতায়াতের কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে সান্তিয়াগো দ্বীপের রিবেরা গ্রান্দে (বর্তমান সিদাদে ভেলহা) অঞ্চলে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে।
এই সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী এবং ক্রীতদাসদের মাধ্যমে কেপ ভার্দেতে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর মুসলিমরা আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে আনা বহু ক্রীতদাসের ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি ছিল শক্তিশালী।
তবে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম ক্রীতদাসদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হতো এবং কোরআন তিলাওয়াত, মসজিদ নির্মাণ কিংবা প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
১৫৯৪ থেকে ১৬২৫ সালের মধ্যে পর্তুগিজ লেখকদের বিবরণে মুসলিম প্রচারকদের রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। দীর্ঘ দমন-পীড়নের ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক ইসলামি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি। তবে কেপ ভার্দিয়ান ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিলকা ভাষার কিছু শব্দ ও সাংস্কৃতিক উপাদানের মাধ্যমে ইসলামের ক্ষীণ ছাপ আজও বিদ্যমান।
স্বাধীনতার পর মুসলমানদের অগ্রযাত্রা
১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের নতুন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। ফলে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক বিধিনিষেধের অবসান ঘটিয়ে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার সুযোগ পান।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক উদারীকরণের কারণে পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ইকোওয়াসভুক্ত দেশগুলো থেকে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালের এক আইনের মাধ্যমে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনগুলো বিচার মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের মাধ্যমে আইনি স্বীকৃতি ও করছাড়ের সুবিধা পেতে শুরু করে। মুসলিম সংগঠনগুলোও এ সুবিধার আওতায় আসে।
জনসংখ্যা ও বসতির বিস্তার
২০২১ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দেতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৯০০ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ।
ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (IOM) ২০২২ সালের জরিপে দেখা যায়, দেশটির বিদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর ৩৭.৪ শতাংশ গিনি-বিসাউ এবং ১১.৩ শতাংশ সেনেগাল থেকে এসেছে। ফলে মুসলিম জনসংখ্যার বড় অংশই এসব দেশের অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত।
মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বসতি রাজধানী প্রাইয়া ও বন্দরনগরী মিনদেলোতে। এছাড়া বোয়া ভিস্তা ও সাল দ্বীপের পর্যটন ও নির্মাণকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম অভিবাসী কাজ ও বসবাস করছেন।
মসজিদ ও ধর্মীয় অবকাঠামো
কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের ধর্মীয় অবকাঠামো এখনো সীমিত। সাল দ্বীপে বর্তমানে তিনটি ছোট ইবাদতখানা রয়েছে, যেখানে নিয়মিত নামাজ ও জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে স্থানীয় ইসলামি সংগঠনগুলো একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জমি বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছে।
অন্যদিকে রাজধানী প্রাইয়ায় ইমাম আহমাদু নেকা থিয়ানের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভূমি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখনো সম্পন্ন হয়নি।
বর্তমানে অধিকাংশ ধর্মীয় অনুষ্ঠান অস্থায়ী ও অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রগুলোতেই অনুষ্ঠিত হয়।
মুসলিম সংগঠন ও নেতৃত্ব
কেপ ভার্দের মুসলিমদের অন্যতম প্রধান সংগঠন হলো কম্যুনিদাদে ইসলামিকা দে কাবো ভের্দে। তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এটি দেশের সব অঞ্চলের মুসলিমদের সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।
এ কারণে ২০২২ সালের শেষ দিকে অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা দে দাওয়াহ দে কাবো ভের্দে নামে নতুন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১ সদস্যবিশিষ্ট এই সংগঠন ইসলামি দাওয়াহ, নতুন মুসলিমদের সহায়তা, জাকাত বিতরণ এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন সৌদি আরবে ইসলামি শিক্ষাপ্রাপ্ত গিনি-বিসাউয়ের নাগরিক ইমাম ইবরাইমা সিদি এবং মুয়াজ্জিন সেকু সুয়ারে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
সংখ্যায় কম হলেও মুসলিমরা কেপ ভার্দের সমাজ ও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান অবদান রাখছেন। বিশেষ করে খুচরা ব্যবসা, হস্তশিল্প ও সেবাখাতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ স্থানীয় ক্যাথলিকপ্রধান ক্রেওল সমাজের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
১৯৯২ সালের ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন এবং সংবিধানের সমঅধিকার নীতির ফলে মুসলিমরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হন না।
২০২২ সালে কেপ ভার্দে ধর্মীয় সহনশীলতা বিষয়ে একটি ইকোওয়াস সম্মেলনের আয়োজন করে, যা আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতি দেশটির অঙ্গীকারকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে।
উৎসব ও ধর্মীয় জীবন
রমজান মাসে মুসলিমরা নিয়মিত রোজা পালন করেন এবং ইফতার ও সেহরির মাধ্যমে পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
ঈদুল ফিতরের দিনে রাজধানী প্রাইয়ার ‘তিরা শাপিউ’ মাল্টিপারপাস হলে শত শত মুসল্লি একত্রিত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। একই সঙ্গে দরিদ্রদের মধ্যে ফিতরা বিতরণ করা হয়।
স্থানীয়ভাবে ‘তাবাস্কি’ নামে পরিচিত ঈদুল আজহা তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। ঈদের জামাত শেষে নির্ধারিত এলাকায় কোরবানি সম্পন্ন করা হয় এবং মাংসের একটি অংশ অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এ ছাড়া মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সীমিত পরিসরে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
মুসলিমদের বর্তমান চ্যালেঞ্জ
কেপ ভার্দেতে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় থাকলেও অভিবাসী মুসলিমদের সামনে কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে।
২০১৪ সালে প্রবর্তিত কঠোর রেসিডেন্স পারমিট (REJ) নীতির কারণে বহু সেনেগালিজ মুসলিম কর্মসংস্থান ও বৈধ কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
এ ছাড়া দ্বীপদেশটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং পর্যটন খাতের ওঠানামার প্রভাবও অনেক অভিবাসী পরিবারের ওপর পড়ছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কেপ ভার্দেতে উগ্রবাদ বা ধর্মীয় চরমপন্থার কোনো রেকর্ড নেই। দেশটি এখনো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ধর্মীয় সহনশীলতার একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের অবদান
বর্তমানে জেরাল্ডো গাউডেন্সিও গোমেজ কেপ ভার্দের মুসলিম সম্প্রদায়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জাতীয় ঐক্য, শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে পর্যটনশিল্পের দ্রুত বিকাশে সেনেগালিজ মুসলিম শ্রমিকরা হোটেল সেবা, নির্মাণ শিল্প ও হস্তশিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ ছাড়া স্থানীয় নওমুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত আল ওয়াসিলাহ ফাউন্ডেশন সাও ভিসেন্তে দ্বীপে দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্য সহায়তা প্রদান এবং আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদারে কাজ করছে।
মুসলিম অভিবাসীদের মাধ্যমে সেনেগালিজ ঐতিহ্যবাহী খাবারও কেপ ভার্দের খাদ্যসংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে, যা দেশটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্রে মুসলিমরা সংখ্যায় অল্প হলেও অর্থনীতি, সমাজসেবা, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।