Image description

জি-সেভেন জোটের সম্মেলন ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত মিলছে। ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে আয়োজিত এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতার পথে এগোনোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন মিত্র দেশগুলোর নেতারা।

বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক নীতিগত অবস্থান, বাণিজ্য চাপ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে। অনেক নেতার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিবর্তন সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতির অংশ হয়ে উঠছে।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলো এখন এমন এক ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় নির্ভরযোগ্য অংশীদার নাও থাকতে পারে।

এবারের জি-সেভেন সম্মেলনে ইরান সংকট বড় একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলেছে এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি করছে, তবুও মিত্র দেশগুলো এতে পুরোপুরি আশ্বস্ত নয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর বিশ্লেষক ম্যাক্স বার্গম্যান বলেন, ইউরোপ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার সময় শেষ হয়ে এসেছে।

এদিকে ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে নেতৃত্ব না দিলে কী হবে—এই প্রশ্ন এখন ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় হয়ে উঠেছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কও যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের আগ্রহ ইউরোপে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ফাটলকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ইউরোপীয় স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে স্বাধীন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য হলেও নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও মিত্র দেশগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাইছে না। বরং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই তারা মনোযোগ দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এবারের জি-সেভেন সম্মেলন কেবল একটি নিয়মিত বৈঠক নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণের সূচনা। আগামী ন্যাটো সম্মেলনে এই পরিবর্তনের আরও স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

সূত্র: দ্য ওয়াশিংট পোস্ট