কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ৭৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। এ নিয়ে গত চার দিনে দেশটির বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার থেকে মোট ২২১ জন বাংলাদেশি উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরলেন।
বুধবার (১৭ জুন) রাতে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩৩৯ ফ্লাইটে ভুক্তভোগী বাংলাদেশিরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। প্রতিবারের মতো এবারও বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির সহায়তায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ভুক্তভোগীদের জরুরি খাবার ও বাড়ি পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।
ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের একজন জানান, দালালরা তাঁকে কম্বোডিয়ায় সরাসরি কোম্পানিতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছিল। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র দিয়ে তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু কম্বোডিয়া বিমানবন্দর থেকে তাঁকে মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর দালালরা আর কোনো ভিসার ব্যবস্থা করেনি। সেখানে গিয়ে কোনো কোম্পানির অস্তিত্বও খুঁজে পাননি তিনি। উল্টো সেখানকার রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা টাকার বিনিময়ে তাঁকে একটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে তাঁদের বাধ্য করা হতো এবং অনবরত শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। কাজ করতে না চাইলে টর্চার সেলে নিয়ে বৈদ্যুতিক শকের পাশাপাশি চলত নির্মম নির্যাতন। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্ক্যাম সেন্টারবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করলে চাইনিজ চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যায়। এরপরই তাঁরা সেখান থেকে মুক্তি পান।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মী চাকরি নিয়ে কম্বোডিয়া গেছেন। তবে ফেরত আসা বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, হাজার হাজার কর্মী সেখানে চাকরি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সবাইকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
এর আগে গত ১২ জুন ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং ১৭ জুন ৭৮ জন ভুক্তভোগী শূন্য হাতে দেশে ফেরত আসেন। এর আগে এ বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরেন। তাঁদেরও থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট (Mae Sot) হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় এবং নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম নিয়ে সবার সচেতনতা জরুরি। এটি মানবপাচারের এক ভয়াবহ ধরন। ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাঁদের ওপর চাপ দেওয়া হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
তিনি আরও বলেন, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। চার দিনে ২২১ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে বিপুলসংখ্যক মানুষ এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার। ফেরত আসা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী ইতিমধ্যে মামলা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত পুরো ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
ব্র্যাক জানিয়েছে, কম্পিউটার বা কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ (ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। এরপর চাকরিপ্রার্থীদের সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। তাই থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।