Image description

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

 
অনুলোমেন বলিনং প্রতিলোমেন দুর্জনম।
আত্মতুল্যবলং শত্রুং বিনয়েন বলেন বা।।

 

এটি একটি বিখ্যাত চাণক্য শ্লোক। এর অর্থ: শক্তিশালী ব্যক্তিকে নমনীয় আচরণ বা কৌশলে বশ করে জয় করতে হয়। দুষ্ট বা খারাপ প্রকৃতির মানুষকে মোকাবিলা করতে হয় কঠোর আচরণের মাধ্যমে, কারণ এদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে এরা সুযোগ নেয়। আর নিজের সমান শক্তির শত্রুকে নম্রতা অথবা শক্তি—এই দুটির যেকোনো একটি প্রয়োগ করে দমন করা উচিত।

রাজনীতির কৌশলে ভরা এই প্রাচীন শ্লোকের কথায় কেন হঠাৎ আসা, তা স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় উল্টালেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

তখন দেশে জরুরি অবস্থা চলছে। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী এবং সঞ্জয় গান্ধী চালাচ্ছেন তাঁর বুলডোজার। ঠিক এই সময়ে জয়প্রকাশ নারায়ণ বা জেপি, যিনি একদা কংগ্রেসেরই লোক ছিলেন এবং সেখানে থেকেই যাঁর নেতারূপে উত্থান, তিনি ভারতের গণতন্ত্রের চেহারা নিয়ে গভীরভাবে ভাবিত ছিলেন।

পরবর্তী সময়ে যখন কংগ্রেসকে হারিয়ে জনতা পার্টি ক্ষমতায় এলো, তখন এই জেপি একসময় অত্যন্ত হতাশ ও ক্রুদ্ধ হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ অক্টোবর 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' পত্রিকায় প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি এমনিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে, কিন্তু প্রয়োজন পড়লে তা-ই নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি নিশ্চিত যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অস্তিত্বের আর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু জেপির অবস্থা সঙ্ঘের হাতে তখন সেই মেঘের মতো, যে গর্জায় কিন্তু বর্ষায় না।

এমন অবস্থায় কেমন করে এলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ? সঙ্ঘের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার আগে, আরও খানিক পিছনের দিকে যাওয়া দরকার।

১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেসের ঘটনাপ্রবাহে জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং তাঁর দল কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি বা সিএসপি-এর ভূমিকা ছিল বেশ জটিল। মহাত্মা গান্ধী এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যকার আদর্শগত লড়াইয়ে সমাজতন্ত্রী জেপির এই অবস্থান পরবর্তীকালে ভারতের বামপন্থী আন্দোলনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

স্বাধীনতার আগে, কংগ্রেসের ভিতরে ডান এবং বামপন্থীদের দ্বন্দ্ব যখন তীব্র হচ্ছে, তখন সেই বছরের জানুয়ারি মাসে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিএসপি এবং অন্যান্য বামপন্থী গোষ্ঠীগুলি সরাসরি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভোট দিয়েছিল। এই নির্বাচনে মহাত্মা গান্ধী সমর্থিত প্রার্থী পট্টাভি সীতারামাইয়াকে ১৫৮০-১৩৭৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্র বসু পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন।

কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর, মার্চ মাসে যখন মধ্যপ্রদেশের ত্রিপুরীতে মূল অধিবেশন বসে, তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। সেখানে গোবিন্দ বল্লভ পন্থ একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, সুভাষচন্দ্র বসুকে গান্ধীজির ইচ্ছা ও পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে হবে।

এই পন্থ প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটির সময় জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সুভাষচন্দ্রের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো দিকেই ভোট দেয়নি।

এই দ্বিমুখী বা নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণ হিসেবে জেপি ও তাঁর দলের নেতারা যা বলেছিলেন তা হলো—গান্ধীজি ও কংগ্রেসের ডানপন্থী নেতাদের বাদ দিয়ে সুভাষচন্দ্রের একক নেতৃত্বে আন্দোলন চালানো সম্ভব নয়। সুভাষচন্দ্রকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে গিয়ে যদি কংগ্রেস ভেঙে যায়, তবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়বে।

আর তাঁদের নীতি ছিল কংগ্রেসের ভেতরেই থাকা। সিএসপি নেতারা গান্ধীজির নেতৃত্বের উপর আস্থা বজায় রেখে কংগ্রেসের মূল কাঠামোর ভিতরে থেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রচার করতে চেয়েছিলেন। সিএসপি নিরপেক্ষ ভূমিকা নেওয়ায় পন্থ প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে পাস হয় এবং সুভাষচন্দ্র বসু তীব্র একাকিত্বের সম্মুখীন হয়ে শেষ পর্যন্ত এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সিএসপি-এর এই অবস্থানকে পরবর্তীতে অনেক বামপন্থী কর্মী ও সুভাষ অনুসারীরা এক ধরণের 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে গণ্য করেছিলেন।

সঙ্ঘ কেমন অবস্থায় ছিল সে কথা বলার আগে জেপি-র কথা আরেকটু বলা প্রয়োজন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জেপি ধীরে ধীরে সিএসপি থেকে সরে আসেন। প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টি বা পিএসপি গড়লেও, পরবর্তীতে তিনি গান্ধীর আদর্শে এবং আচার্য বিনোবা ভাবের সাহচর্যে সর্বোদয় ও ভূদান আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যান। এর ফলে একসময় তিনি প্রত্যক্ষ সংসদীয় রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে সরে গিয়েছিলেন।

জমিদারদের কাছ থেকে পায়ে হেঁটে চাষীদের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ জমি চাওয়া এবং তার মাধ্যমে সবার কল্যাণ ঘটানোর এই অহিংস কাজের মধ্যেই জেপির আসল স্ববিরোধ লুকিয়ে ছিল। ক্ষমতা ও সম্পদ যে মানুষ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চায় না, এই সহজ বাস্তবটি তিনি বুঝতে পারেননি। অবশ্য যাঁর ব্যক্তিগত জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে গান্ধীর সবরমতী আশ্রমে রেখে আমেরিকায় গিয়ে সমাজতন্ত্রী হয়ে ফিরেছিলেন—তাঁর রাজনৈতিক ভাবনায় এমন স্ববিরোধ থাকাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।

পরবর্তীকালে এই আন্দোলনগুলোর কারণে এবং আন্তর্জাতিক নানা সমস্যায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে তাঁর নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

এরপর ১৯৭২ সালে গণতন্ত্র রক্ষা, নির্বাচন সংস্কার এবং কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'লোকপাল' নিয়োগের দাবি নিয়ে তিনি আবার রাজনীতির মূলস্রোতে ফিরে আসেন। লোকপাল নিয়ে আন্না হাজারের আন্দোলনের মূল উৎস আসলে এখানেই লুকিয়ে ছিল।

সে কথা পরে হবে। জেপির কথায় ফিরি। ১৯৭৪ সালে যখন কংগ্রেসের দুর্নীতি চরম সীমায় পৌঁছয়, তখন জেপি 'সম্পূর্ণ বিপ্লব'-এর ডাক দিয়ে দেশের তরুণদের রাজনীতিতে টেনে আনতে চাইলেন। কিন্তু শুধু ডাক দিলেই তো আর আন্দোলন হয় না, তার জন্য প্রয়োজন শক্ত সংগঠন আর জনবল। ঠিক এই চরম সংকটের সময়েই জেপির দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সঙ্ঘপরিবার। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে জেপির আন্দোলনে সর্বশক্তি দিয়ে এগিয়ে এলেন বিশিষ্ট কর্মী ও নেতা নানাজি দেশমুখ।

দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ভাবধারায় প্রভাবিত নানাজি দেশমুখ ১৯৪০ সালে সর্বক্ষণের প্রচারক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিলেন। পূর্ব উত্তরপ্রদেশে প্রায় ২৫০টি শাখা খুলেছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে যখন সঙ্ঘ 'রাষ্ট্রধর্ম', 'পাঞ্চজন্য' এবং 'দৈনিক স্বদেশ' পত্রিকা প্রকাশ করে, তখন তার প্রধান পথপ্রদর্শক ছিলেন উপাধ্যায়। সেই সময়ে অটল বিহারী বাজপেয়ি ছিলেন সম্পাদক এবং নানাজি ছিলেন ম্যানেজিং ডিরেক্টর। নানাজিই ১৯৫২ সালে গোরখপুরে প্রথম সরস্বতী শিশু মন্দির বিদ্যালয় খোলেন, যার আজ দেশজুড়ে অনেক শাখা রয়েছে।

এই নানাজি দেশমুখ জয়প্রকাশ নারায়ণ বা জেপির 'সম্পূর্ণ বিপ্লব' আন্দোলনে নিশ্চিতভাবে সঙ্ঘের অনুমতি নিয়েই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য নানাজি যে সেইবারেই প্রথম কোনো প্রাক্তন সমাজতন্ত্রী বা অসাম্প্রদায়িক বলে পরিচিত নেতার সঙ্গে হাত মেলালেন, তা নয়। এর আগে ১৯৬৭ সালে উত্তরপ্রদেশে প্রথম অ-কংগ্রেসী সরকার গড়তে তিনি চরণ সিং, রামমনোহর লোহিয়া এবং দীনদয়াল উপাধ্যায়কে একমঞ্চে এনেছিলেন। অতএব, জেপির আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সঙ্ঘ বা নানাজি নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন করেননি।

বস্তুত সঙ্ঘ নিজেকে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিলেও, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে তার একটি রাজনৈতিক চেহারার প্রয়োজন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নতুন দিল্লির বিড়লা হাউসের (বর্তমানে গান্ধী স্মৃতি) প্রাঙ্গণে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘাতক নাথুরাম বিনায়ক গডসে ছিলেন একজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী। গান্ধীর সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সভায় তাঁকে হত্যা করা হয়।

গান্ধীহত্যার পর নিষেধাজ্ঞা এবং জনমানসের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জন্য একটি রাজনৈতিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর এই সংকটের সময়েই তাঁদের কাজে লাগলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। শ্যামাপ্রসাদ ১৯২০-তে ছিলেন কংগ্রেস। বাংলার বিধানপরিষদের সদস্য।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন শ্যামাপ্রসাদ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্দল প্রার্থী হিসেবে বাংলার বিধান পরিষদে জয়লাভ করেন। এর কিছুদিন পর তিনি বিনায়ক দামোদর সাভারকরের অনুগামী হয়ে হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন। আবার ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে হওয়া নির্বাচনে জয়ী এ কে এ ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি ১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলার কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং অর্থমন্ত্রী হন।

এখানেই শেষ নয়, ১৯৪০ সালের লাহোর সম্মেলনে ফজলুল হক যখন মুসলিম লীগের সেশনে 'পাকিস্তান প্রস্তাব' উত্থাপন করছেন, তখনও শ্যামাপ্রসাদ বাংলার মন্ত্রিসভায় ছিলেন। এমনকী ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে যখন 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন শুরু হয়, তখন সেই আন্দোলন দমনের পদ্ধতি নিয়ে বাংলার ব্রিটিশ লাট বা গভর্নরকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন তিনি। আবার দেশভাগের পর, ১৯৪৭ সালে তিনি কেন্দ্রে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে গঠিত প্রথম জাতীয় মন্ত্রিসভায় যোগও দিয়েছিলেন। অর্থাৎ অবস্থান পাল্টে পাল্টে যাবার সক্ষমতা তাঁর যথেষ্টই ছিল।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের গোলওয়ালকর এবং হেডগেওয়ারের সাক্ষাৎ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মোড় এনেছিল। ১৯৪০ সালে যখন সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের প্রচণ্ড রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলছে, ঠিক তখনই গোলওয়ালকরের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়। এর আগে মধ্য তিরিশের দশকে হেডগেওয়ারের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। সঙ্ঘের আদর্শে প্রভাবিত হয়ে লাহোরের এক সভায় শ্যামাপ্রসাদ সঙ্ঘকে 'ভারতের মেঘাচ্ছন্ন আকাশে একমাত্র রূপালি রেখা' বলে প্রশংসা করেছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে সঙ্ঘের অন্যতম সক্রিয় নেতা বসন্ত ওকের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের বৈঠক হয়। ওক ছিলেন সঙ্ঘের পক্ষ থেকে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। তিনি শ্যামাপ্রসাদকে স্পষ্ট আশ্বাস দেন যে, জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভা ছেড়ে এলে সঙ্ঘ তাঁকে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে। অবশ্য এরপরও গোলওয়ালকর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত ১ এপ্রিল ১৯৫০ সালে শ্যামাপ্রসাদ নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বহুল প্রচারিত ধারণা অনুযায়ী এটি কেবল নেহরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতার কারণে ছিল না। কারণ, চুক্তিটি নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখনই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন এবং মূল চুক্তিটি কিছুটা নরম হয়ে সই হয়েছিল ৮ এপ্রিল। অবশ্য দুই দেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই চুক্তিটি পরবর্তীতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল।

নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী যখন দেখলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ দল গঠন নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছে না, তখন তিনি নিজেই ২৩ এপ্রিল ১৯৫১ সালে বাংলায় 'পিপলস পার্টি' গঠন করেন। এর কিছুদিন পর, ২৭ মে, আরেক হিন্দুত্ববাদী নেতা বলরাজ মাধোকের প্রস্তাবে জলন্ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে পাঞ্জাব ও দিল্লির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য 'জনসংঘ' প্রতিষ্ঠা করা হবে।

প্রকৃতপক্ষে আরএসএস কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই গোলওয়ালকরকে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু গোলওয়ালকর খুব ভালোভাবেই জানতেন যে সঙ্ঘ নিজে সরাসরি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে বিরোধীদের পক্ষে তাদের আক্রমণ করা সহজ হবে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে কোনো বড় রাজনৈতিক সংকট এলে সঙ্ঘের আর পিছু হঠার বা ফেরার কোনো জায়গা থাকবে না। ওদিকে মহাত্মা গান্ধীহত্যার পর সঙ্ঘের উপর নেমে আসা নিষেধাজ্ঞার স্মৃতিও তাঁদের গভীরভাবে ভাবাচ্ছিল।

এই পরিস্থিতিতে বসন্ত ওক, বলরাজ মাধোক এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মিলে যখন জনসংঘ গঠন করলেন, তখন সঙ্ঘের একটি রাজনৈতিক মুখ বা নির্ভরযোগ্য ঢাল তৈরি হলো। এই নতুন দল সঙ্ঘের হিন্দুত্ববাদী আদর্শকে সংসদীয় রাজনীতিতে রক্ষাও করবে, আবার দলের কোনো বিপদ হলে তার আঁচ সরাসরি মূল সঙ্ঘের উপর পড়বে না।

শ্যামাপ্রসাদও সঙ্ঘের সুসংগঠিত কর্মী ও নেতাদের শক্তিকে পাশে পেয়ে নির্বাচনে আবার নিজের রাজনৈতিক জমি ফিরে পাওয়ার আশায় বিভোর হলেন। কিন্তু তিনি তখনো আন্দাজ করতে পারেননি যে সঙ্ঘকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন না, বরং সঙ্ঘই একদিন তাঁকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ ড. মুখার্জী হয়তো ভেবেছিলেন হিন্দু মহাসভা আর সঙ্ঘের চরিত্র একই, কিন্তু এই দুটি মঞ্চ যে সম্পূর্ণ আলাদা—সেই রাজনৈতিক সত্যটি বুঝতে তাঁর কিছুটা সময় লেগেছিল।

সে কথায় পরে আসা যাবে। আগে দেখা যাক, সঙ্ঘের সংসদীয় রাজনীতির মুখ হিসেবে জন সঙ্ঘকে শ্যামাপ্রসাদ আদর্শগতভাবে কোন কৌশল উপহার দিলেন! এইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন দলের নাম কেন 'হিন্দু রাষ্ট্রীয় দল' করা হলো না, কারণ তাতে কেউ কেউ ভুল বুঝবে, বললেন শ্যামাপ্রসাদ।

তিনি মনে করতেন, ব্রিটিশরা আসলে 'হিন্দু' শব্দটাকে একটি সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে দিয়েছে, অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো হিন্দুস্তানের সবাই আসলে হিন্দু। কিন্তু তাঁর মতে, যতক্ষণ না এই সাম্প্রদায়িক তকমা মুছে গিয়ে 'হিন্দু' শব্দটিকে একটি সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক ভাবধারা হিসেবে ভারতের সবাই গ্রহণ করছে, ততক্ষণ এই শব্দটি সরাসরি রাজনৈতিক দলের নামে ব্যবহারের উপযুক্ত সময় আসবে না।

নতুন দলের এই তাত্ত্বিক কাঠামোতে মুসলমান সমস্যার স্থায়ী সমাধানের রূপরেখাও তৈরি করা হয়েছিল। সঙ্ঘ ও জনসংঘের নেতারা একমত ছিলেন যে, স্বাধীনতার সঙ্গেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দেশভাগের পর যাঁরা পাকিস্তানে চলে গেলেন, তাঁরা তো গেলেনই। কিন্তু ভারতের মাটিতে যাঁরা থেকে গেলেন, তাঁরা যখনই নিজেদের ধর্মের উপাসনা পদ্ধতি বজায় রেখেও মূল ভারতীয় বা হিন্দু সাংস্কৃতিক ভাবধারা মেনে চলবেন, তখনই এই দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব চিরতরে মিটে যাবে।

তবে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে, দেশের যে সমস্ত নাগরিক 'হিন্দু' শব্দটিতে কোনো রকমের অস্বস্তি বোধ করবেন, তাঁদের জন্য 'ভারতীয়' বা 'ইন্ডিয়ান' শব্দটাকে কাজে লাগানো যায়। মাধোকের বিবরণ অনুসারে, এই ছিল ড. মুখার্জীর কৌশল। আর এই সূক্ষ্ম কৌশলের উপর ভিত্তি করেই দলের নাম 'হিন্দু রাষ্ট্রীয় সঙ্ঘ' না হয়ে রাখা হলো 'ভারতীয় জনসংঘ'—যাতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে এই মঞ্চে দেশের যেকোনো নাগরিকই অনায়াসে যোগ দিতে পারেন।

এই কৌশলটিকে সঙ্ঘ দীর্ঘকাল কাজে লাগিয়েছে। ১৯৫১ সালে দল গড়ে তোলা এবং ১৯৫১-৫২ সালের সাধারণ নির্বাচন পরিচালনা করার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঙ্ঘের এই প্রথম রাজনৈতিক দলটিকে আরও পোক্ত করে তোলে। কিন্তু এই সাংগঠনিক প্রসারের আড়ালে জনসংঘের উপর নিজেদের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সঙ্ঘের মূল লক্ষ্য, যার ফলে দলের ভিতরেই শুরু হয় এক তীব্র অভ্যন্তরীণ লড়াই।

জনসংঘের নানা পর্যায়ের নেতা ও কর্মী প্রায় সবাই ছিলেন আরএসএস-এর সক্রিয় সদস্য। প্রথম নির্বাচনের পরেই সঙ্ঘের এই কর্মীরা দলের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শুরু করে কার্যকরী কমিটি—সব নিজেদের দখলে নিয়ে নেন। এর ফল মিললো অচিরেই। ১৯৫৪ সালের নভেম্বরে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও তৎকালীন সভাপতি মৌলি চন্দ্র শর্মা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পদত্যাগ করার সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় সব স্তরে সঙ্ঘের এই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকেই দায়ী করেছিলেন। কিছুদিন পর একই কারণে দল ছাড়েন দিল্লি জনসংঘের প্রভাবশালী নেতা গুরু দত্ত।

এই সংকটের সময়ে দলের উদার ও গণতান্ত্রিক অংশের সঙ্গে রক্ষণশীল অংশের যে লড়াই চলছিল, সেখানে সঙ্ঘের পাশে দাঁড়ালেন দলের সম্পাদক ও সঙ্ঘের প্রধান তাত্ত্বিক দীনদয়াল উপাধ্যায়।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী আমৃত্যু এই দলেই ছিলেন এবং সঙ্ঘের এমন একমুখী আচরণে তিনিও ভিতরে ভিতরে সমস্যা বোধ করেছিলেন। কিন্তু তখন তাঁর আর অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না। তাছাড়া তিনি ভেবেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্ঘের কর্মীরা নির্বাচনী গণতন্ত্রের রীতিনীতি শিখবেন এবং তাঁদের মনোভাব আরও উদার হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল তার ঠিক উল্টোটা।

সঙ্ঘ তার মূলকেন্দ্র থেকে কোনো লিখিত প্রস্তাব ছাড়াই, স্রেফ মৌখিক নির্দেশ পাঠিয়ে দলের প্রতিটি নীতি ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। সঙ্ঘের এই স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ১৯৬১ সালেও একদল উদারপন্থী নেতা জনসংঘ ত্যাগ করেন। কিন্তু তাতেও সঙ্ঘের নীতি বদলায়নি। ধীরে ধীরে, কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে সঙ্ঘ দীনদয়াল উপাধ্যায়কে সামনে রেখে জনসংঘকে নিজের শক্ত মুঠোয় নিয়ে নিল। তারা এমন এক নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা তৈরি করল, যাতে কেউ কোনোভাবেই এই রাজনৈতিক দলটিকে সঙ্ঘের আওতা থেকে বের করতে না পারে।

কংগ্রেসের সঙ্গে ভারতীয় জনসংঘের আদর্শগত ব্যবধান তখন ছিল দুস্তর। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) ও জনসংঘ সরাসরি দেশভাগ এবং পাকিস্তানের জন্মের জন্য মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর নীতিকে দায়ী করত। একই সঙ্গে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে 'মুসলমান তোষণ'-এর অভিযোগও তুলত তারা। এই তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের আবহেই ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক বিপর্যয় ঘটে গেল। লোকসভায় কোনোমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এই নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ও ভোটের হার মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং দেশের আট থেকে নয়টি রাজ্যে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই ঘটনাটি একটি বড়সড় ভূমিকম্পের মতো ছিল।

এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক পতনের নেপথ্যে ছিল এক তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, জওহরলাল নেহরুর অনুপস্থিতি এবং বিরোধী দলগুলির ঐক্য। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল, যার ফলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধাক্কা লাগে। এর উপর দেশজুড়ে ভয়াবহ তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।

এমন এক কঠিন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে ভারতীয় টাকার অবমূল্যায়ন ঘটান, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং বিরোধী দলগুলিকে আন্দোলনের বড় হাতিয়ার করে দেয়।

পাশাপাশি, ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহরু এবং ১৯৬৬ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর ফলে কংগ্রেসে এক বিরাট রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী তখন রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নতুন ও অনভিজ্ঞ। সেই কারণে দলের ভিতরে ও বাইরে তাঁকে 'গুঙ্গি গুড়িয়া' বা বোবা পুতুল বলেও কটাক্ষ করা হতো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দলের ভিতরের প্রবীণ সিন্ডিকেট নেতাদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী ও মোরারজি দেশাইয়ের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, যা কংগ্রেসকে সাংগঠনিকভাবে একেবারে দুর্বল করে দিয়েছিল।

ওদিকে অ-কংগ্রেসী দলগুলির রাজনৈতিক ঐক্য হলো। সমাজতান্ত্রিক নেতা রামমনোহর লোহিয়া খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে কংগ্রেসের শক্তির আসল উৎস হলো বিরোধী দলগুলির ভোটের বিভাজন। আর এই বিভাজন রুখতেই তিনি সব অ-কংগ্রেসী দলকে, তা সে বামপন্থী হোক বা ডানপন্থী, একজোট হওয়ার ডাক দেন, যা ভারতের ইতিহাসে 'অ-কংগ্রেসবাদ' নামে পরিচিত। এই রণকৌশল অনুযায়ী দলগুলি নিজেদের মধ্যে আসন সমঝোতা করে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একক প্রার্থী দাঁড় করায়, যার ফলে কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক পুরোপুরি ভেঙে যায়।

ভাষা আন্দোলন ও আঞ্চলিকতাও ছিল আরেকটি বড় কারণ। বিশেষ করে মাদ্রাজ রাজ্যে (বর্তমান তামিলনাড়ু) কংগ্রেস সরকারের চাপিয়ে দেওয়া হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে তীব্র 'হিন্দি-বিরোধী আন্দোলন' গড়ে ওঠে। এর ফলে সেখানে আঞ্চলিক দল ডিএমকে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে, চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে দেশজুড়ে লাগাতার বনধ, ছাত্র আন্দোলন এবং শ্রমিক ধর্মঘট চলছিল, যা সামাল দিতে কংগ্রেস সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

এই সুযোগে বিরোধীরা সেবারে রাজ্যস্তরে 'সংযুক্ত বিধায়ক দল' গঠন করে লড়াইয়ে নামে এবং তাতে ভারতীয় জনসংঘও যোগ দেয়। বিহার, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশে। পাঞ্জাবে তারা অকালি দলকে বড় শক্তি বলে মেনে নেয়, এমনকী চিরশত্রু সিপিআই- বা কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া-কেও জোটসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে তাদের বাধেনি।

আরএসএস তখন দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এমন এক গ্রহণযোগ্যতা এবং সম্মান খুঁজছিল, যা মহাত্মা গান্ধীহত্যার পর তাদের গায়ে লাগা কলঙ্কের দাগ পুরোপুরি মুছে দেবে। আর এই লক্ষ্যেই ১৯৬৭ সালে জনসংঘের সভাপতির ভাষণে উপাধ্যায় বলেছিলেন, যেকোনো জনবিক্ষোভের মধ্যেই যাঁরা কমিউনিস্টদের হাত দেখেন, তাঁদের নিয়ে তাঁরাও কৌতূহলী।

এই কৌতূহল প্রকাশটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক। উপাধ্যায় স্পষ্ট জানান, সেই সময়ে সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ ও জনবিক্ষোভ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং স্বাভাবিক। এই বিক্ষোভকেই একটি গঠনমূলক বিপ্লবে পরিণত করতে এবং আন্দোলনের পথ প্রদর্শন করতেই তাঁরা সক্রিয়ভাবে যোগ দিচ্ছেন। অর্থাৎ নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চিরশত্রু কমিউনিস্টদের সম্পর্কেও প্রকাশ্যে এক ধরনের নরম মনোভাব নিয়েছিলেন তখন।

গোলওয়ালকরের একটি সাক্ষাৎকার মনে পড়ে যায় এই পথ প্রদর্শনের কথায়। সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস কোনোদিন রাজনৈতিক দল হবে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে এম এস গোলওয়ালকর একবার মহাভারতের কৃষ্ণের উদাহরণ দিয়েছিলেন। কৃষ্ণের হাতের মুঠোয় ছিল বিরাট এক সাম্রাজ্য, কিন্তু তিনি নিজে কোনোদিন সিংহাসন গ্রহণ করেননি। গোলওয়ালকরের এই বক্তব্য আসলে সঙ্ঘের দীর্ঘমেয়াদি দর্শনেরই অংশ। বস্তুত আরএসএস বহুকাল ধরে নিজে সরাসরি 'রাজা' নয়, বরং ক্ষমতার নেপথ্যে থেকে 'রাজগুরু' বা চালিকাশক্তি হওয়ার কথাই ভাবছিল। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলির মধ্যেও সঙ্ঘের এই দর্শনের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি ছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তৎকালীন সময়ের গণবিক্ষোভকে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগানোর সুনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষাও। অর্থাৎ ভারতীয় রাজনীতিতে আরএসএস তখন ক্রমশই পোক্ত ও চতুর হয়ে উঠছিল। নিজেদের মূল উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা কোনো বাধাই মানতে রাজি ছিল না। প্রয়োজন পড়লে চরম আদর্শগত শত্রুর সঙ্গেও মৈত্রী স্থাপন করতে তাদের বাধেনি, যা 'স্তালিন-রিবেনট্রপ' চুক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। উপাধ্যায় যেভাবে এগোচ্ছিলেন, তাতে আরও অনেক কিছুই ঘটতে পারতো। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হলো, সে প্রসঙ্গের আলোচনা আমাদের উপজীব্য নয়।

উপাধ্যায়ের মৃত্যুর আগে বলরাজ মাধোক, আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের সঙ্গে তাঁর এবং মূল সঙ্ঘের বড়সড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। মাধোক দলের সভাপতি হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত গুরুত্ব জাহির করতে চাইছিলেন। বিশেষ করে সমাজতন্ত্রীদের প্রভাবে জনসংঘের পক্ষ থেকে ব্যাঙ্কের জাতীয়করণকে সমর্থন করা এবং কমিউনিস্টদের সঙ্গে হাত মেলানোর মতো বিষয়ে তাঁর তীব্র আপত্তি ছিল। তিনি খোলাখুলি জনতার সামনে দলের এই সমস্ত অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করতে থাকেন এবং সংগঠনে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র আনার দাবিতে 'সংগঠন মন্ত্রী' পদগুলি তুলে দেওয়ার ওকালতি শুরু করেন।

ব্যক্তিত্বের এই সংঘাত সামাল দিতে তখন লালকৃষ্ণ আদবানিকে সামনে এনে লড়াইয়ে নামে সঙ্ঘ। আদবানি মাধোকের 'ফেঁপে ওঠা ইগো' নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সঙ্ঘ পরিবার একটি অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছিল। সঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নিয়ম হলো—দলের কোনো সদস্য, তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, নিজের ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিত্বের পূজা উপভোগ করতে পারবেন না। তেমন কোনো লক্ষণ দেখা গেলে তাঁকে সরাসরি দলের দরজা দেখিয়ে দেওয়া হবে অথবা দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে।