Image description

আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের নজির এরই মধ্যে স্থাপন হয়েছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে। সবকটি দেশই ভারতের প্রতিবেশী। এসব দেশে আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকার রেখেছে তরুণরা, যারা জেন-জি নামে পরিচিত। বেকারত্বের হতাশা ও সরকারের দুর্নীতি থেকেই এসব আন্দোলনের সূত্রপাত। প্রথমে ছোট ছোট মিছিল, বিক্ষোভ তারপর বড় সমাবেশ। এক সময় তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে সরকার পতন হয়।

বাংলাদেশ ও নেপালের পর প্রশ্ন ওঠে একই ধরনের আন্দোলন ভারতেও হতে যাচ্ছে কিনা। ২০১৪ সালের পর থেকেই একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করছে মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। উন্নয়ন আর হিন্দুত্ববাদের প্রচারণা চালিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে দলটি। তবে সবশেষ লোকসভার নির্বাচনে দেখা গেছে বিজেপি আর আগের মতো মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। বিশেষ করে তরুণদের। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির টোপ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে শুরু করেছে দেশটির তরুণরা।

এরই মধ্যে সরকারের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শুরু করছ তরুণরা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন পরীক্ষার অনিয়মকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। যার বড় প্রমাণ হলো ককরোচ বা তেলাপোকা জনতা পার্টির উত্থান। সামান্য একটি ব্যাঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিলো। এরই মধ্যে লাখ লাখ তরুণ এই আন্দোলনে নাম লিখিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই আন্দোলনকে ঘিরে স্বস্তিতে নেই বিজেপি সরকার। তরুণদেরকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ সামাজিক মাধ্যমে তাদের বেশি কয়েকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইনস্টাগ্রামে তেলাপোকা পার্টির ফলোয়ারের সংখ্যা বিজেপি বা কংগ্রেসকে ছাড়িয়ে গেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

যদিও দেশটির অনেক বিরোধী দলের নেতা সরকারের ওই পদক্ষেপের সমালোচনা করে জানায়, গণতান্ত্রিক অধিকার সবার রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের জায়গা থাকা উচিত।

প্রথমে মনে করা হচ্ছিল অনলাইনে জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তবে এই ধারণা পাল্টে গেছে শনিবার (৬ জুন) দিল্লিতে অনুষ্ঠিত তেলাপোকা পার্টির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে।

এরই মধ্যে হাজার হাজার তরুণ সেখানে সমবেত হয়েছেন। রাজধানী দিল্লির জন্তর মন্তরে শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপি লিখেছে, আমরাই শিক্ষামন্ত্রীকে নির্বাচিত করে সেখানে পাঠিয়েছি, তিনি আমাদের করের টাকায় বেতন পান। অথচ তার আমলে কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ককরোচরা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান বিদায় নিচ্ছেন। শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। কারণ পাঁচজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বাসভবনের বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

তেলাপোকা জনতা পার্টি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়। এক শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত বেকার তরুণদের একটি অংশকে ‘ককরোচ’ (তেলাপোক) -এর সঙ্গে তুলনা করলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই এই ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা হয়।

এই বিক্ষোভ কেন্দ্র করে নরেন্দ্র মোদী সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ দেশটিতে তরুণদের এই ধরনের আন্দোলন এটাই প্রথম। দেশটিতে এর আগে রাজনৈতিক দলের বাইরে তরুণদের নেতৃত্বে কোনো সমাবেশ বা বিক্ষোভ হয়নি। তবে হ্যাঁ, রাজনৈতিক দল বা কৃষকদের অনেক আন্দোলন হয়েছে। তবে সেই সব আন্দোলনকে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ও অত্যন্ত সংবেদশীল। কারণ এই তরুণদের নেতৃত্বেই প্রতিবেশী দেশগুলোতে সম্প্রতি সরকার পতন হয়েছে। যা মোদী সরকার খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে বা জানে। তাই অন্য আন্দোলনের মতো তরুণদের দমন করতে চাইলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

তেলাপোকা জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে তরুণরা এখন মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে। তাদের জোড়ালো দাবি হচ্ছে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। এখন যদি সরকার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাহিষ্কার না করে তাহলে তরুণরা ছোট ছোট সমাবেশ বা বিক্ষোভের মাধ্যমে আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারে। অন্যদিকে যদি সরকার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাহিষ্কার করে তাহলে মোদী সরকারের দুর্বলতা সামনে চলে আসবে। এর সুযোগ নিতে শুরু করবে বিরোধীদলগুলো। তাছাড়া এই আন্দোলনেও পেছন থেকে তরুণদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকবে তারা। এরই মধ্যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিকমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন।

একই সঙ্গে তেলাপোকা জনতা পার্টির বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু কর্মী সোনাম ওয়াংচুকও। এর আগে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক জানান, তিনি অভিজিৎ দিপকের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন যে এই আন্দোলনটি ভারতীয় তরুণদের কণ্ঠস্বর বহন করছে, কোনো বিদেশি শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, তার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে তাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই। তারা অত্যন্ত দেশপ্রেমিক এবং দেশের উন্নয়নের জন্য ত্যাগ স্বীকার করছেন।

ভারতের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য সরকারগুলোতে মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ভালো ফলাফল করলেও কেন্দ্রীয় সরকার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। কারণ লোকসভায় বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। সংসদে যে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় জোটের দিকে। সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করতে গিয়ে বড় ধাক্কা খায় মোদী সরকার। কারণ জোট তাতে সমর্থন দেয়নি।