Image description
প্রশ্নের মুখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

ভারতের দ্বিচারি আচরণে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক। একদিকে প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চায়; অন্যদিকে অবৈধ বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারতীয় মুসলিমদের প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা করছে বিএসএফ। সীমান্ত এলাকার স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে ভারত এমনটা করছে। যদিও কিছুদিন থেকে বিজিবি হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে বিএসএফের এমন অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে বিজিবি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর সীমান্তে এমন প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে প্রায়ই সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা অব্যাহত রয়েছে। ভারত সরকারের এমন উদ্ভট আচরণে বাংলদেশের জনগণ ও সচেতন মহলে ক্রমেই ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়ছে। কোনো অবৈধ বসবাসকারী চিহ্নিত হলে তাকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে। অভিযোগ উঠেছে, ভারত এ রকম প্রক্রিয়ার কথা মুখে বললেও কার্যত বেছে নিয়েছে পুশইনের মতো অপেশাদার ও অমানবিক পন্থা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, ভারত এক ধরনের মিশ্র মেসেজ দিচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, ভারতে বসবাসকারী অবৈধ বাংলাদেশিদের বিষয়ে বাংলাদেশ যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সেটি একটি যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব। কিন্তু বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের বিএসএফ পুশইনের যে ঘটনা তাতে বাংলাদেশের জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তারা একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কোনো কোনো সীমান্তে দেখা যাচ্ছে বিজিবির সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণও সম্পৃক্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, এখানে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। কারণ জনগণও যদি সম্পৃক্ত হয়ে যায় তাহলে নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে একবার দুই দেশের জনগণের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই জনগণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। সমস্যা সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং কূটনীতিক চ্যানেলে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। প্রতিটি দেশেরই এসব বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নীতিমালা আছে। সেগুলো মেনেই পরিস্থিতির সমাধান করতে হবে।

ভারত সরকার বছরখানেক আগে দেশটিতে অবৈধ বসবাসকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছিল। সেখানে বারবার উঠে আসে অবৈধ বাংলাদেশিদের কথা। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির জ্যেষ্ঠ প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী (বর্তমানে মূখ্যমন্ত্রী) জিতলে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিবেন বলেও জানান।

সর্বশেষ গত শুক্রবার ভারতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণায়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল দিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিসহ সব বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় তিনি বলেন, একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, ভারত তা আরও শক্তিশালী করে এগিয়ে নিতে চায়।

তিনি বলেন, অবৈধভাবে কেউ ভারতে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থান অভিন্ন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের আইন রয়েছে এবং সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্দেহভাজন অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ভারত। এ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম আরও মসৃণ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সেসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই ভারত কেন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২ জুন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সীমান্তে যে কোনো ধরনের অবৈধ পুশইন ও পুশব্যাকের বিরোধী সরকার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত দিয়ে পুশইনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ ও প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে। সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে আছে। এদিন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হন এবং অন্য দেশে অবস্থান করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আইনগত নিয়ম মেনে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.) এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, আমরা মনে করতাম, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়া। আসলে এটি স্বার্থের সম্পর্ক। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে ভারতের কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল তা আমরা পাইনি। বরং আমরা দেখেছি ভারত সব সময় নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করেছে।

তিনি বলেন, সাপটা, সার্কেও ভারত তাদের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যতগুলো চুক্তি হয়েছে সেখানে তারা তাদের স্বার্থ শতভাগ রক্ষা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের নায্য চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা সব সময় গড়িমসি করেছে। সেটা গঙ্গা বা তিস্তার পানি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে প্রাধান্য দিয়েই সব কাজ করেছিল। কিন্তু বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে ততবার শুধু ভারত নয়, বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। এবারও তাই করেছে। তবে কৌশলের অংশ হলেও ভারত বর্তমান বিএনপি সরকারের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। কিন্তু সীমান্তে যা করছে তার সঙ্গে তাদের ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বক্তব্যের কোনো মিল নেই। প্রায়ই সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করে চলেছে। এমনকি সীমান্তের কিছু এলাকায় তারা সীমান্ত চিহ্নিতকরণ জিরো লাইন পেরিয়ে কাঁটাতার দিয়েছে। ফ্লাড লাইট দিয়ে আমাদের কৃষিজমির ক্ষতি করেছে। তারা আসলে এগুলো করবেই। মুখে সুন্দর কথা বললেও ভারত সব সময় চেষ্টা করবে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের কাজের জন্য যেসব আইন আছে তার প্রয়োগ, প্রতিবাদ, কূটনৈতিক মোকাবিলা বাংলাদেশ করেনি এতদিন। তাই তারা এত সাহস পেয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর অবৈধ বাংলাদেশিদের অবস্থান নিয়ে এই যে এত হুংকার দিচ্ছে সেখানে কিন্তু ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ এবং দলটির কয়েকশ নেতার বিষয়ে কিছু বলছে না। বাংলাদেশের মানুষ তো তাদের বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য জানতে চায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি যেমন তারা স্পষ্ট করেছে, তেমনি বাকিদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত টুঁ-শব্দটি করেনি। তিনি মনে করেন, তাদের এতই যখন পুশইন করার শখ, তাহলে এসব চিহ্নিত পলাতক নেতাদের কেন পুশইন করে না। এটিই এখন বড় প্রশ্ন। তাহলে কি ঢাকা ধরে নেবে, তারা ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে।

এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতকর্মী যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা তো বিজেপির মেহমান। এজন্য হয়তো তাদের পুশইন করা হবে না। পুশইন যাদের করা হচ্ছে তারা হতদরিদ্র মানুষ। সীমান্তে তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।