Image description
বিএনপিতে হাইব্রিডদের দৌরাত্ম্য

ফেনীর মেহেদী হাসান। ২০২২ সাল থেকে জেলার দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের ছাত্রদলের সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। ছাত্রদলের কমিটিতে নাম থাকায় ওই বছর থেকে পতিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় বাড়িছাড়া হন তিনি। এরপর সপরিবারে আশ্রয় নেন ফেনী শহরে ছোট্ট এক ভাড়া বাসায়। শুরুর দিকে গরুর খামারে কাজ করে কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা চালান। বেশ কিছুদিন এভাবেই মানবেতর দিন যাপন করেন তিনি। দুঃখজনক হলেও সত্য, চব্বিশের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও এলাকায় না যেতে পেরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাকে। আবার এখন তার ওপরে অত্যাচার করা সেই আওয়ামী লীগ নেতারাই বিএনপির সঙ্গে মিশে গিয়ে তাকে এলাকায় ফিরতে বাধা দিচ্ছে। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও নিজের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মেহেদী। এখনও তার ভরসা সেই অটোরিকশা।

মেহেদীর মতো এভাবেই বিএনপির তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর মানবেতর জীবন কাটছে। অনেক জায়গায় আবার হামলারও শিকার হচ্ছেন। দল ক্ষমতায় থাকার পরও কেন এমন অবস্থা-এ নিয়ে বিভিন্ন জেলা শাখার নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে যুগান্তর।

জেলা নেতাদের মতে, মেহেদীর মতো ত্যাগী নেতাদের অনেকেই এখন ভালো নেই। কারণ ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে নতুন করে সুবিধাবাদী আর হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের উত্থান হয়েছে। বিগত কোনো আন্দোলনে বা দলের কোনো পদে না থাকলেও অনেকেই এখন বিএনপি সেজেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারাই এখন সব জায়গায় হর্তাকর্তা হয়ে বসেছেন। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েছেন নানা অপকর্মেও। তাদের কারণে ত্যাগীরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপির দেখা পাওয়া কিংবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার শীর্ষ নেতারাও আগের মতো আর খোঁজ নেন না।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি তো সারাক্ষণ আমার কর্মীদের মধ্যে থাকি। সুতরাং মন্ত্রীদের বিষয়ে যে অভিযোগ এটা ঠিক না’। দাগনভূঞার ছাত্রদলের নেতার মানবেতর জীবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওখানকার নেতারা যারা আছেন অবশ্যই সেটা দেখবেন এবং দেখা উচিতও। তার জন্য কি করা যায় আমরা চেষ্টা করে দেখব।

পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি যুগান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রী হওয়ার আগে বা পরের বিষয় নয়, আমি সব সময়ই নিয়মিত এলাকায় যাই। আমার নেতাকর্মী-সমর্থকদের খোঁজ-খবর নেই। ফোনেও সব সময় তারা আমাকে পান’। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী আছে। এরমধ্যে আমাদের অনেক ছেলে আছে; যাদের আর্থিক উপার্জন অত্যন্ত দুর্বল এবং তারা কেউ কেউ অসহায়। আমাদের অবগত করলে আমরা তাদের সাপোর্ট দেব’ তিনি বলেন, ‘অর্থ বছর মাত্র শুরু হবে। সর্বশেষ পার হওয়া অর্থবছর অল্প সময়ে অসহায় নেতাকর্মীদের কাজে লাগানো সেভাবে সম্ভব হয়নি। আমরা খোঁজ-খবর নিচ্ছি। অবগত হলেই আমরা তাদেরকে সহযোগিতা দেব।’

শুক্রবার দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা মেহেদী হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিগত আন্দোলনে তার রাজপথে থাকার এক ডজনেরও বেশি ছবি ও ভিডিও পাঠান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘যাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছি তারা কেউ এখন আমাকে চেনেন না। স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাদের কাছে গিয়েছি, এলাকায় যেতে কেউ সহায়তা করেনি। এক সপ্তাহ আগে আমার অটোরিকশায় জেলা বিএনপি নেতা রতন উঠলে আমাকে চিনতে পারেন। পরে তার কাছে সবকিছু খুলে বলি। বুধবার রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন। সভাপতিকে বলেছি, আওয়ামী লীগের যারা নির্যাতন করেছে, তারা বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে রয়েছেন। এ সময় রাকিব অভয় দিয়ে বলেছেন, তুমি এলাকায় থাকবে, রাজনীতি করবে।’

এদিকে মেহেদীর সঙ্গে রাকিবের কথপোকথনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে মেহেদীর সঙ্গে রাকিবের কথা বলার সময় পাশে বসা বিএনপি নেতা রতনকে কাঁদতে দেখা যায়।

ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ও বর্তমান অন্তত ১৫ জন নেতা যুগান্তরকে জানান, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করেছেন। তাদের বন্ধু-বান্ধব অনেকেই এখন সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু অনেকেই আবার রাজনীতিতে নেমে চাকরির খোঁজার সময় পাননি। বিগত সরকারের হামলা-মামলায় অনেকে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। কিন্তু দল ক্ষমতায় এলেও এখন আগের মতো কোনো নেতা আর খোঁজ নেন না। মন্ত্রী-এমপিদের কাছে গেলেও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

তারা আরও বলেন, আন্দোলনের সময় মিছিল করার আগে নেতাকর্মী নিয়ে আসার জন্য যারা অন্তত দিনে ১০ বার ফোন করতেন, ক্ষমতায় আসার পার এখন আর তারা ফোন ধরছেন না। দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবেন-এই আশায় এখনও রাজনীতি করছেন। একটি সেল গঠন করে ত্যাগীদের, বিশেষ করে যারা শিক্ষিত নেতাকর্মীদের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানোর দাবি করেন তারা।

ছাত্রদলের সাবেক দুইজন সহ-সভাপতি যুগান্তরকে আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাবা-মা মনে করেছিল বিএনপি ক্ষমতায় এলে অন্তত একসঙ্গে ঈদ করা যাবে। কিন্তু দুই ঈদেও বাড়ি যাওয়া হয়নি। বাড়ি যেতে চাইলে খরচের ব্যাপার আছে। নিজেই চলতে পারছি না, বাড়তি খরচ কিভাবে করব।’

সম্প্রতি রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলামের বক্তব্যেও তৃণমূলের হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। বক্তব্যে রাকিব বলেন, ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত আন্দোলন এবং পরবর্তীতে সেই জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী যারা রক্ত দিয়েছে, সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই এই বিএনপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় মঞ্চে ও মঞ্চের সামনে বসা মন্ত্রী-এমপিদের উদ্দেশ্য করে ছাত্রদলের সভাপতি বলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক হলেও নিবেদন রাখছি, আপনারা এই দিনগুলোর কথা কখনো ভুলে যাবেন না। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বহু নির্যাতিত নেতাকর্মী রয়েছেন; যারা বিগত সাড়ে ১৫ বছর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনীতিকে বুকে ধারণ করে আপনাদের আগলে রেখেছিল। আগামীতেও তারা যেন আপনাদের আগলে রাখে। আত্মীয়-স্বজনকে প্রশ্রয় দেবেন না। আবারও বলে যাচ্ছি, কোনো আত্মীয়-স্বজনকে আপনারা প্রশ্রয় দেবেন না।’

এছাড়াও সম্প্রতি নাটোরে এক সভায় জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক বাবুল চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপিকে ধ্বংস করতে দেবেন না। দেড় বছর হয়ে গেছে একটি কমিটিও ত্বরান্বিত করতে পারিনি। সব নেতাকর্মী আজকে পদবিহীন বসে আছে। সংগঠন যদি না থাকে, দল চালাবেন কি করে? নিজের আমিত্ব আর ক্ষমতাকে জাহির করতে গিয়ে দলটাকে ধ্বংস করবেন না। এই দলের পেছনে অনেক শ্রম আছে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেখে পালিয়ে গেছি, তারপরও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করিনি। আপনাদের সঙ্গে ছিলাম দলকে ভালোবেসে, অন্য কিছুর লোভে নয়।’

জেলা পর্যায়ের বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিককালে সংঘঠিত কিছু ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি রংপুরে থানার ভেতরে সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব রাকিবুল ইসলামকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার ঘটনা হাইকমান্ডকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার দাবি করেছেন নেতারা। রক্তাক্ত অবস্থায় রাকিবুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, আওয়ামী লীগ আমলেও মামলা ও কারাগারে গিয়েছেন, কিন্তু এভাবে কখনও মারধর করা হয়নি। এছাড়া গত রোববার পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ৫ নেতাকর্মীর ওপর হামলা করেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এমন ঘটনা আরও বেশ কয়েক জায়গায় ঘটেছে, যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখছেন না বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, বাস্তবতা হলো সরকারের তিন মাস পার হলেও প্রশাসনে এখনো কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, বিএনপি মধ্যপন্থি একটি দল। সরকার দেশকে একটি স্থিতিশীল জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে। আর সরকারের এই সহনশীল ভূমিকার সুযোগ নিচ্ছেন কিছু আমলা ও পুলিশসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। এ ঘটনা ঘটতে থাকলে বিএনপি নেতাকর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে যাবে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এখানে কিছুসংখ্যক মানুষ দেশে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করতে চাইছে। কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক দলও এর মধ্যে জড়িত আছে। তারাই এসব ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে।