Image description

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মাসব্যাপী চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়া রোধ করতে মধ্যস্থতাকারীরা তাদের তৎপরতা জোরদার করেছেন। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও কাতার ইরানে বিশেষ প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে বলে গত শুক্রবার কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা জানিয়েছেন।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন। উচ্চপর্যায়ের এই সফরটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা গতি পেয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো চুক্তির কতটা কাছাকাছি রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে এখনো ‘গভীর ও ব্যাপক’ মতপার্থক্য রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা ইরনা’র বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপাতত আমাদের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ বন্ধ করা।;

তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘কূটনীতিতে সময় লাগে।’

অনুরূপভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার সুইডেন সফরকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু অগ্রগতি হলেও কূটনীতিকরা এখনও চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি।;

তিনি আরো বলেন, ‘আমি আশা করি আমরা সেখানে পৌঁছাব। প্রেসিডেন্ট একটি ভালো চুক্তি করতে বেশি পছন্দ করবেন।’

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে। এটি এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা সম্পর্কে অবগত দু’জন কূটনীতিকের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি করানোর উদ্দেশ্যে কাতারও কর্মকর্তাদের একটি দল ইরানে পাঠিয়েছে। তবে কাতারি প্রতিনিধি দলটি ঠিক কবে তেহরান ভ্রমণ করেছে তা স্পষ্ট নয়। সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই তথ্য জানিয়েছেন।

কূটনীতিকরা আরো জানান, রয়টার্সের প্রতিবেদন করা কাতারি দল পাঠানোর এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করেই নেওয়া হয়েছে। কাতার এর আগেও ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের গোপন মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যার মধ্যে গত বছর ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সহায়তা করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেই এই পর্যায়ক্রমিক কূটনৈতিক তৎপরতা উন্মোচিত হলো।

ট্রাম্প এই সপ্তাহে জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তির চেষ্টা করার জন্য আরো কিছুটা সময় চাওয়ায় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে একটি খুব বড় ধরনের হামলা স্থগিত করেছেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করলেও কূটনৈতিক পরিস্থিতি এখনও নাজুক বলে হুঁশিয়ার করেছেন। গত শুক্রবার রুবিও জানান, ‘মার্কিন কর্মকর্তারা ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সাথে ‘সব রকমের যোগাযোগ’ রাখছেন এবং এই আলোচনায় পাকিস্তানই প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

তিনি আরো বলেন, ‘যেকোনো ধরনের চুক্তির ‘মূল স্তম্ভগুলোর’ মধ্যে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখার অঙ্গীকার করেছেন এবং এ পর্যন্ত হওয়া আলোচনার একটি বড় অংশ ছিল, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করতে বা তাদের পরমাণু স্থাপনাগুলো বন্ধ করতে সম্মত হবে কি-না, তা নিয়ে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই এই সপ্তাহে জানিয়েছেন, তেহরান ওয়াশিংটনের সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াগুলো পেয়েছে এবং সেগুলো পর্যালোচনা করছে।

তবে গত শুক্রবার তিনি এও বলেন, বর্তমান আলোচনাটি কেবল যুদ্ধ বন্ধের ওপর সংকীর্ণভাবে ফোকাস বা কেন্দ্রীভূত।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি-র তথ্য অনুযায়ী বাঘাই বলেন, ‘এই পর্যায়ে পরমাণু সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।’

তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে বারবার দাবি জানিয়ে আসছে, তবে ইরানও তার নিজস্ব অবস্থানে অনড় রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার আমাদের রয়েছে।’

এদিকে ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন যখন আশাবাদ ও হুমকির দোলাচলে রয়েছে, তখন ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করছে বলে মনে হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুর দিনগুলো থেকেই ইরান এই জলপথটি অবরোধ করার চেষ্টা করছে, যা সামুদ্রিক যান চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি বা শুল্ক আদায়ের একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থার বিষয়ে ওমানের সাথে আলোচনা করছে ইরান, যা তেহরানকে এই সমুদ্রপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, জাহাজগুলোকে টোল দিতে বাধ্য করার যেকোনো ইরানি পদক্ষেপ ‘কূটনৈতিক চুক্তিকে অসম্ভব করে তুলবে।’

 

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস