Image description

দেশভাগের প্রায় আট দশক পর পাকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর লাহরে শুরু হয়েছে অতীতের সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ। ইসলামীয় নামের পরিবর্তে হিন্দু, শিখ, জৈন ও ঔপনিবেশিক আমলের পুরনো নাম ফিরিয়ে আনছে প্রশাসন। পাকিস্তানের পঞ্জাব সরকারের এই পদক্ষেপ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে দেশভাগ-পূর্ব লাহোরের বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাস।

‘হোয়াট’স ইন আ নেম?’— উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত উক্তিকেই যেন বাস্তবে রূপ দিল পাকিস্তান। দেশটির ঐতিহ্যবাহী লাহোর শহরের বিভিন্ন এলাকা, সড়ক ও গলির ইসলামীয় নাম পরিবর্তন করে পুরনো হিন্দু, শিখ, জৈন এবং ঔপনিবেশিক নাম পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত থেকে পৃথক হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। সেই সময় লাহোরের বহু এলাকার নাম পরিবর্তন করে ইসলামীয় বা জাতীয়তাবাদী পরিচয়ে নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল। প্রায় আট দশক পর আবারও সেই পুরনো নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামপুরা এলাকার নাম আবার কৃষ্ণনগর করা হয়েছে। দেশভাগের আগে ওই এলাকার নাম ছিল কৃষ্ণনগরই। একইভাবে বাবরি মসজিদ চকের নাম পরিবর্তন করে জৈন মন্দির চক এবং সুন্নত নগরের নাম পুনরায় সন্ত নগর করা হয়েছে।

এছাড়া মুস্তাফাবাদের নাম আবার ধরমপুরা করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। পাকিস্তানের পঞ্জাব সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য লাহোরের দেশভাগ-পূর্ব সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় পুনরুদ্ধার করা।

পাকিস্তানের পঞ্জাব সরকারের এক কর্মকর্তা সংবাদসংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, কয়েক দিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পঞ্জাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে লাহোর ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন রাস্তা এবং সড়কের ঐতিহাসিক নাম পুনর্বহালের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে।

গত দুই মাসে লাহোরের বিভিন্ন এলাকায় পুরনো নাম-সম্বলিত নতুন সাইনবোর্ডও দেখা গেছে। ইতোমধ্যে অন্তত নয়টি স্থান আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পুরনো পরিচয় ফিরে পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৌলানা জাফর আলি খান চক, যার আগের নাম ছিল লক্ষ্মী চক। এখন আবার সেই নামই ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

ডেভিস রোড, যা পরে স্যার আগা খান রোড নামে পরিচিত হয়েছিল, সেটিও আবার পুরনো নামে ফিরে যাচ্ছে। একইভাবে ফাতিমা জিন্না রোডের নাম পরিবর্তন করে কুইন্স রোড করা হয়েছে।

‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাহোরের বিখ্যাত লরেন্স গার্ডেনের নাম একসময় বদলে ‘বাগ-এ-জিন্না’ করা হয়েছিল। বহু বছর পর আবারও তার পুরনো নাম ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

প্রাচীরঘেরা শহর লাহোরের সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল ও লাহোর মানবাধিকার কাউন্সিলের সচিব কামরান লাশারী বলেন, মানুষ এখনও ওই জায়গাগুলোকে পুরনো নামেই ডাকে।

তার মতে, লাহোরের পরিচয় মুসলিম, শিখ, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের সম্মিলিত বহুমাত্রিক রূপ। সে কারণেই পুরনো নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কামরান আরও বলেন, লাহোরের রাস্তা-গলির নাম খ্রিস্টান, শিখ, হিন্দু বা পার্সি যা-ই হোক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশভাগ-পূর্ব পঞ্জাবের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আবহ আবারও ফিরে আসছে লাহোরে। পঞ্জাবের অমৃতসর থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহর একসময় ছিল পঞ্জাবিদের অভিন্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান ছিল।

লাহোরের পুরনো বাজার, কলেজ, বাগান, আখড়া, মন্দির, গুরুদ্বার ও তীর্থস্থান সেই সময়কার ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। তবে দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কারণে অধিকাংশ হিন্দু ও শিখ পরিবার শহর ছেড়ে চলে যায় অথবা তাদের চলে যেতে বাধ্য করা হয়।

এরপর ধীরে ধীরে লাহোরের বহু রাস্তা, এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নাম পরিবর্তন করে ইসলামীয় বা জাতীয়তাবাদী নামকরণ করা হয়। কৃষ্ণনগর হয়ে যায় ইসলামপুরা, ধরমপুরা হয় মুস্তাফাবাদ এবং জৈন মন্দির চক হয়ে যায় বাবরি মসজিদ চক।

তবে সরকারি নথিপত্রে নাম বদলালেও সাধারণ মানুষের মুখে পুরনো নামগুলো টিকে ছিল। চা বিক্রেতা, দোকানদার, রিকশাচালক থেকে স্থানীয় বাসিন্দা— অনেকেই দৈনন্দিন জীবনে এখনও পুরনো নাম ব্যবহার করেন।

লাহোরে বর্তমানে ১০০টিরও বেশি স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের বহু স্থাপনা পুনরুদ্ধারের কাজও চলছে। এর মধ্যে রয়েছে মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের আমলের বিভিন্ন ভবন ও গির্জা।

এছাড়া লাহোর দুর্গ কর্তৃপক্ষ শিখ রাজপরিবারের শেষ বংশধর রাজকুমারী বাম্বা সাদারল্যান্ডের একটি চিত্রকর্মও পুনরুদ্ধার করেছে।

কামরান লশারি জানান, এর আগে লাহোরে মহারাজা রণজিৎ সিংহের মূর্তি স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেটি ভাঙচুর করা হয়। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে এবং মানুষ আরও উদার ও উন্মুক্তমনা হয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।

সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগে লাহোরের ক্রীড়া ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পিটিআই জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ লাহোরের ঐতিহাসিক ক্রিকেট মাঠ ও মিন্টো পার্কের পুরনো কুস্তি আখড়া পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব দিয়েছেন।

এই মাঠ থেকেই দেশভাগের আগে উঠে এসেছিলেন ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার লালা অমরনাথ। একই মাঠ পাকিস্তানকে দিয়েছে ইনজামাম-উল-হকেএর মতো তারকা ক্রিকেটার।

একসময় ওই আখড়ায় লড়েছেন কিংবদন্তি কুস্তিগির গামা পালোয়ান ও ইমাম বখশ। দেশভাগের আগে লাহোরের হিন্দু পরিবারগুলোও প্রতি বছর দশেরা উদযাপনের জন্য সেখানে জড়ো হতো।

সব মিলিয়ে, লাহোরে পুরনো নাম পুনর্বহালের এই উদ্যোগ শুধু সাইনবোর্ড বদলের ঘটনা নয়; বরং এটি বহুস্তরীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া পরিচয় ফিরে পাওয়ার এক প্রতীকী প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা